সময় এক অদৃশ্য নীরব স্রোত-যা কখনো থামে না, কারো জন্য অপেক্ষা করে না, ফিরে তাকিয়েও দেখে না। জানুয়ারি এলেই মানুষ ঘোষণা দেয়-পুরোনো বছর বিদায় নিয়েছে, নতুন বছর এসেছে। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়-বছর কি সত্যিই নতুন হয়? নাকি সময় একই থাকে, শুধু আমাদের বয়স, আমল আর দায়বদ্ধতার খাতায় আরও একটি পৃষ্ঠা যুক্ত হয়?
প্রথম জানুয়ারি আজ বিশ্বজুড়ে এক তথাকথিত উৎসবের দিন। আতশবাজি, আলোকসজ্জা, নাচ-গান, মদ্যপান, উন্মত্ততা আর লাগামহীন ভোগের নামে দিনটি উদযাপিত হয়। দুঃখজনক হলেও সত্য, এসব আয়োজনের কোথাও ধর্মীয় চেতনা, মানবিক দায়িত্ব কিংবা সমাজকল্যাণের কোনো স্থান নেই। বরং সেখানে প্রকাশ পায় পাপাচার, অশ্লীলতা ও অবাধ্যতার এক নগ্ন প্রদর্শনী।
গভীরভাবে লক্ষ্য করলে দেখা যায়, এ ধরনের আনন্দে মত্ত মানুষ মূলত সময়ের প্রকৃত মূল্য সম্পর্কে উদাসীন। তারা জীবনের আসল উদ্দেশ্য থেকে অনেক দূরে সরে গেছে।
অথচ ইসলামে সময়ের গুরুত্ব অপরিসীম। মানুষের জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত, প্রতিটি নিঃশ্বাস আল্লাহর পক্ষ থেকে পাওয়া এক অমূল্য আমানত। সময় এমন এক মূলধন, যার ভিত্তিতেই আখিরাতে মানুষের চূড়ান্ত হিসাব-নিকাশ নির্ধারিত হবে। যে ব্যক্তি দুনিয়ায় সময়কে কল্যাণের পথে ব্যয় করে, আখিরাতে তার ফলও হবে কল্যাণময়। আর যে ব্যক্তি সময়কে গুনাহ, অবহেলা ও উদাসীনতায় নষ্ট করে, তার পরিণতি হবে ভয়াবহ।
এই দুনিয়া মূলত এক পরীক্ষাগার-সময় তার প্রশ্নপত্র আর আমল তার উত্তরপত্র।
মুমিন ও কাফিরের জীবনের মৌলিক পার্থক্য এখানেই। কাফির দুনিয়াকে দেখে ভোগবিলাস, খাওয়া-পরা ও আত্মতৃপ্তির ক্ষেত্র হিসেবে। সে জীবন ব্যয় করে আরাম ও প্রবৃত্তির অনুসরণে। এর পরিণতিতে আল্লাহ তার জন্য জাহান্নাম নির্ধারণ করেন। পক্ষান্তরে মুমিন দুনিয়াকে আখিরাতের প্রস্তুতির ক্ষেত্র মনে করে। আল্লাহর ভয়, জাহান্নামের আশঙ্কা ও জান্নাতের প্রত্যাশা তাকে কুফর ও গুনাহ থেকে বিরত রাখে এবং ঈমান ও সৎকর্মের পথে পরিচালিত করে।
আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে ইরশাদ করেন-
“নিশ্চয়ই যারা ঈমান এনেছে ও সৎকর্ম করেছে, আল্লাহ তাদের এমন জান্নাতে প্রবেশ করাবেন, যার নিচ দিয়ে ঝরনাধারা প্রবাহিত হবে। আর যারা কুফর করেছে, তারা দুনিয়ায় ভোগ করছে এবং চতুষ্পদ জন্তুর মতো খাচ্ছে; আর জাহান্নামই হবে তাদের আবাস।” (সুরা মুহাম্মদ : ১২)
এই আয়াতের ব্যাখ্যায় ইবনে আব্বাস (রা.)-এর গভীর তাৎপর্যপূর্ণ উক্তিটি স্মরণযোগ্য। ইমাম ইবনে মুবারক (রহ.) তাঁর আজ-জুহদ ওয়াল রাকায়েক গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, তিনি বলেন-
“মানুষের ওপর এমন এক যুগ আসবে, যখন তাদের প্রধান চিন্তা হবে পেট ভরানো, আর প্রবৃত্তিই হবে তাদের দ্বিন।”
আজ মুসলিম সমাজের দিকে তাকালে ভারাক্রান্ত হৃদয়ে স্বীকার করতে হয়-আমরা ঠিক সেই যুগেই এসে পৌঁছেছি। আমাদের জীবনে সেই ঈমানি দৃঢ়তা ও চরিত্র খুব কমই পরিলক্ষিত হয়, যা কোরআনে মুমিনদের জন্য বর্ণিত হয়েছে। একদিকে হালাল-হারামের তোয়াক্কা না করে পেট ভরানোই জীবনের লক্ষ্য হয়ে উঠেছে; অন্যদিকে দুনিয়াপূজা, নফসপূজা, ব্যক্তিপূজা এবং বিদআত ও ভ্রান্তিকে দ্বিনের নামে নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করা হচ্ছে।
দুনিয়াপ্রীতি আমাদের জীবনের মূল উদ্দেশ্য থেকে এতটাই বিচ্যুত করেছে যে মাস ও বছর কী অদ্ভুত দ্রুততায় গড়িয়ে যাচ্ছে-সে বিষয়ে আমাদের অনুভূতি ও সচেতনতা ক্রমেই লুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। আজ মনে হয় বছর শেষ হয়ে গেল, অথচ কবে গেল, কীভাবে গেল-তার কোনো স্পষ্ট হিসাব আমাদের কাছে নেই। এই অনুভূতিহীনতা নিছক মানসিক সমস্যা নয়; বরং তা কিয়ামতের এক গুরুত্বপূর্ণ আলামত।
রাসুলুল্লাহ (সা.) এ বিষয়ে সুস্পষ্টভাবে সতর্ক করে বলেছেন-
“কিয়ামত ততক্ষণ পর্যন্ত কায়েম হবে না, যতক্ষণ না সময় সংকুচিত হয়ে যাবে। তখন এক বছর একটি মাসের মতো, একটি মাস একটি সপ্তাহের মতো, একটি সপ্তাহ একটি দিনের মতো, একটি দিন একটি ঘণ্টার মতো আর একটি ঘণ্টা আগুন থেকে ছিটকে পড়া এক চিংড়ির মতো হয়ে যাবে।” (তিরমিজি)
সময় সংকুচিত হওয়ার অর্থ এই নয় যে সূর্য-চন্দ্রের গতি বদলে যাবে; বরং এর প্রকৃত অর্থ হলো-সময়ের বরকত ও কল্যাণ উঠে যাবে। মানুষ দুনিয়ার মোহে এমনভাবে ডুবে যাবে যে দিন-রাত, মাস-বছর কিভাবে কেটে যাচ্ছে, তার কোনো অনুভবই আর থাকবে না।
আজকের বাস্তবতা এই হাদিসের জীবন্ত ব্যাখ্যা। ইন্টারনেট ও স্মার্টফোন একদিকে যেমন জ্ঞান ও যোগাযোগের শক্তিশালী মাধ্যম, অন্যদিকে তেমনি সময় নষ্টের সবচেয়ে নীরব ও ভয়ংকর হাতিয়ার। মোবাইল হাতে নিলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কিভাবে কেটে যায়, তার কোনো হিসাব থাকে না। চোখের পলকে সময় শেষ হয়ে যায়, অথচ আত্মা থেকে যায় শূন্য।
একইভাবে দীর্ঘমেয়াদি ক্রিকেট টুর্নামেন্ট, সিরিজ ও খেলাধুলা-যেগুলো মাসের পর মাস চলে-শুধু খেলোয়াড়দের নয়, দর্শক ও অনুসারীদের জীবনের অমূল্য সময়ও গ্রাস করে নিচ্ছে। খেলাধুলার প্রকৃত উদ্দেশ্য হওয়া উচিত সীমিত বিনোদন কিংবা শরীরচর্চা; অথচ আজ অনেকের কাছে তা জীবনের মূল লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অথচ জীবন ও সময় আল্লাহর পক্ষ থেকে পাওয়া এক মহান নিয়ামত। এই নিয়ামতের হেফাজত ও সদ্ব্যবহার করা আমাদের দায়িত্ব। কিন্তু বাস্তবতা হলো-এই দায়িত্ব পালনে আমরা অধিকাংশই উদাসীন। রাসুলুল্লাহ (সা.) সংক্ষেপে কিন্তু গভীর অর্থে বলেছেন-
“দুটি নিয়ামত এমন, যেগুলোর ব্যাপারে অধিকাংশ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত-সুস্থতা ও অবসর।” (বুখারি)
আরেক হাদিসে তিনি উপদেশ দিয়ে বলেন-
“পাঁচটি বিষয়কে পাঁচটির আগে গনিমত মনে করো: জীবনের আগে মৃত্যু, যৌবনের আগে বার্ধক্য, সুস্থতার আগে অসুস্থতা, অবসরের আগে ব্যস্ততা এবং সচ্ছলতার আগে দারিদ্র্য।”
এই উপদেশগুলো যে ব্যক্তি নিজের জীবনের নীতিতে পরিণত করতে পারবে, নিঃসন্দেহে তার দুনিয়া ও আখিরাত-উভয়ই আলোকিত হয়ে উঠবে।















