প্রতিবেদক: মরিয়ম জাহান সেতু
বাংলাদেশসহ বিশ্বের অনেক দেশে আবারও ভয়াবহভাবে ফিরে এসেছে এক সময়ের প্রায় নিয়ন্ত্রিত রোগ হাম। একসময় মনে করা হয়েছিল যে টিকাদান কর্মসূচির কারণে এই রোগ প্রায় নির্মূলের পথে। কিন্তু ২০২৬ সালে পরিস্থিতি বদলে গেছে। বাংলাদেশের হাসপাতালগুলোতে প্রতিদিনই নতুন শিশু আক্রান্ত হচ্ছে, আর মৃত্যুর খবরও বাড়ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী ২০২৬ সালের মার্চ থেকে এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়েই দেশে প্রায় ১৯ হাজারের বেশি সন্দেহভাজন হাম রোগী শনাক্ত হয়েছে এবং শতাধিক শিশু মারা গেছে।
এটি শুধু একটি স্বাস্থ্য সমস্যা নয়, বরং জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার দুর্বলতা, টিকাদান কর্মসূচির ভাঙন এবং সামাজিক সচেতনতার ঘাটতির একটি বড় সংকেত।
বাংলাদেশের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সময়ে দেশে অন্তত ৬০ জন শিশুর মৃত্যুর ঘটনা নিশ্চিত হয়েছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই মৃত্যুর বড় একটি অংশই ঘটেছে এমন শিশুদের মধ্যে যারা এখনও টিকা নেওয়ার বয়সেই পৌঁছায়নি।
এই পরিস্থিতি আমাদের সামনে একটি বড় প্রশ্ন তুলে দেয়, কেন আবার হাম বাড়ছে?
হাম কী?
হাম অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত একটি রোগ। এটি Measles morbillivirus নামের ভাইরাস দ্বারা হয় এবং সাধারণত শিশুদের বেশি আক্রান্ত করে। এই ভাইরাস বাতাসের মাধ্যমে দ্রুত ছড়ায়। আক্রান্ত ব্যক্তি যখন কাশি দেয় বা হাঁচি দেয় তখন ভাইরাস বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে এবং অন্য মানুষের শরীরে প্রবেশ করে। এজন্যই হামকে পৃথিবীর সবচেয়ে সংক্রামক রোগগুলোর একটি বলা হয়। একজন আক্রান্ত ব্যক্তি থেকে একই পরিবেশে থাকা অনেক মানুষের মধ্যে খুব সহজেই সংক্রমণ ছড়িয়ে যেতে পারে।
হামের প্রধান লক্ষণ
হামের লক্ষণ সাধারণত সংক্রমণের ১০ থেকে ১৪ দিনের মধ্যে দেখা যায়। এর মধ্যে রয়েছে:
১) উচ্চ জ্বর
২) কাশি
৩)নাক দিয়ে পানি পড়া
৪)চোখ লাল হয়ে যাওয়া
৫)শরীরে লাল ফুসকুড়ি
প্রথমে মুখ ও ঘাড়ে ফুসকুড়ি দেখা যায়, পরে ধীরে ধীরে তা সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। অনেক ক্ষেত্রে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া বা মস্তিষ্কের সংক্রমণের মতো জটিলতাও দেখা দিতে পারে, যা শিশুদের জন্য প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে।
হঠাৎ হাম বেড়ে যাওয়ার কারণ কি?
১) নতুন জিনোটাইপ B3 :
হামের ভাইরাসের বিভিন্ন জিনোটাইপ রয়েছে, কিন্তু বর্তমানে B3 অনেক দেশে সবচেয়ে বেশি ছড়িয়ে পড়া ধরন হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এই জিনোটাইপ অত্যন্ত সংক্রামক এবং দ্রুত মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়তে সক্ষম।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যেখানে টিকাদানের হার কম বা মানুষের মধ্যে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার ঘাটতি রয়েছে, সেখানে এই জিনোটাইপ দ্রুত প্রাদুর্ভাব তৈরি করতে পারে। ফলে অল্প সময়ের মধ্যেই অনেক মানুষ আক্রান্ত হয়ে পড়ছে। তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বর্তমান হাম টিকা এই জিনোটাইপের বিরুদ্ধেও কার্যকর সুরক্ষা দিতে সক্ষম।
২)টিকাদানের ঘাটতি ও হার্ড ইমিউনিটির ভাঙন:
হামের প্রাদুর্ভাব বৃদ্ধির সবচেয়ে বড় কারণগুলোর একটি হলো টিকাদানের হার কমে যাওয়া এবং এর ফলে সমাজে প্রয়োজনীয় তৈরি না হওয়া। হাম প্রতিরোধ করতে একটি সমাজে অন্তত ৯৫ শতাংশ মানুষের টিকা নেওয়া প্রয়োজন। যখন এই মাত্রা বজায় থাকে, তখন ভাইরাস সহজে একজন থেকে আরেকজনের মধ্যে ছড়াতে পারে না। এতে করে এমন শিশুরাও সুরক্ষিত থাকে যারা এখনও টিকা নেওয়ার বয়সে পৌঁছায়নি।
কিন্তু যদি টিকাদানের হার কমে যায়, তাহলে ভাইরাস খুব সহজেই ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। তখন আক্রান্ত ব্যক্তির মাধ্যমে দ্রুত সংক্রমণের একটি চেইন তৈরি হয়।
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, হামে মৃত শিশুদের প্রায় অর্ধেকই ছিল নয় মাসের কম বয়সী। অর্থাৎ তারা টিকা নেওয়ার সুযোগই পায়নি। এর মানে হলো সমাজে হার্ড ইমিউনিটির সুরক্ষা ভেঙে পড়েছে।
৩) অপুষ্টি ও ভিটামিন এ ঘাটতি:
বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে হামের মৃত্যুর সঙ্গে অপুষ্টির সম্পর্কও গুরুত্বপূর্ণ। গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব শিশু অপুষ্টিতে ভোগে বা যাদের শরীরে এর ঘাটতি থাকে, তাদের ক্ষেত্রে হাম অনেক বেশি মারাত্মক হয়ে ওঠে। ভিটামিন এ শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এর ঘাটতি থাকলে শিশুর শরীর ভাইরাসের বিরুদ্ধে ঠিকভাবে লড়াই করতে পারে না। ফলে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া বা গুরুতর সংক্রমণের ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়।
৪) কোভিডের প্রভাব: টিকাদান কর্মসূচির ব্যাঘাত
বিশ্ব স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ উল্লেখ করছেন। কোভিড মহামারির সময় অনেক দেশে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি ব্যাহত হয়েছিল। মহামারির সময় অনেক পরিবার স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যেতে ভয় পেয়েছে, আবার অনেক এলাকায় টিকাদান কার্যক্রমও সীমিত হয়ে পড়েছিল। এর ফলে কয়েক বছর ধরে অনেক শিশু সময়মতো টিকা নিতে পারেনি। এই ইমিউনিটি গ্যাপ এখন হামের নতুন প্রাদুর্ভাব তৈরি করছে।
কেন শিশুরাই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে?
হাম যেকোনো বয়সের মানুষকে আক্রান্ত করতে পারে, তবে শিশুদের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। বিশেষ করে:
১)যেসব শিশু এখনও টিকা নেয়নি
২)অপুষ্টিতে ভুগছে
৩)ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় বসবাস করে
এদের ক্ষেত্রে সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং জটিলতার ঝুঁকিও বেশি থাকে।
হাম কতটা বিপজ্জনক?
অনেকেই মনে করেন হাম একটি সাধারণ শিশু রোগ। কিন্তু বাস্তবে এটি মারাত্মক জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে।
হাম থেকে যেসব জটিলতা হতে পারে—
১)নিউমোনিয়া
২)ডায়রিয়া
৩)চোখের সংক্রমণ
৪) অপুষ্টি
৫)মস্তিষ্কের প্রদাহ (Encephalitis)
এই জটিলতাগুলো অনেক সময় শিশুর মৃত্যু পর্যন্ত ঘটাতে পারে। ২০২৬ সালের বর্তমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশে কয়েক শত শিশু ইতোমধ্যে মারা গেছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
হাম হলে চিকিৎসা কী?
হামের জন্য নির্দিষ্ট কোনো অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ নেই। চিকিৎসা মূলত উপসর্গ কমানো এবং জটিলতা প্রতিরোধের উপর নির্ভর করে।
সাধারণ চিকিৎসার মধ্যে রয়েছে—
১) জ্বর কমানোর ওষুধ
২)পর্যাপ্ত বিশ্রাম
৩)পর্যাপ্ত পানি পান
৪)পুষ্টিকর খাবার
৫) ভিটামিন-এ সাপ্লিমেন্ট
বিশেষ করে ভিটামিন-এ শিশুদের জটিলতা কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। যদি নিউমোনিয়া বা অন্য জটিলতা দেখা দেয়, তাহলে হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিতে হয়।
হাম প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায়
হাম প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো টিকা।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, একটি দেশে হাম নিয়ন্ত্রণ করতে হলে কমপক্ষে ৯৫% শিশুদের টিকাদানের আওতায় আনতে হবে। বাংলাদেশে বর্তমানে জরুরি ভিত্তিতে নতুন টিকাদান কর্মসূচি চালু করা হয়েছে, যাতে আগে টিকা মিস করা শিশুদের দ্রুত টিকা দেওয়া যায়।
বর্তমান হাম সংকট আমাদের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়।
প্রথমত, টিকাদান কর্মসূচি কখনোই থেমে থাকা উচিত নয়।
দ্বিতীয়ত, জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার ধারাবাহিকতা বজায় রাখা জরুরি।
তৃতীয়ত, মানুষকে টিকা সম্পর্কে সচেতন করতে হবে।
একটি ছোট প্রশাসনিক ব্যর্থতা বা অবহেলাও বড় জনস্বাস্থ্য সংকটে পরিণত হতে পারে, বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি তারই উদাহরণ।
হাম নতুন কোনো রোগ নয়। কিন্তু আমাদের অবহেলা, টিকাদান ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কারণে এটি আবারও বড় হুমকি হয়ে ফিরে এসেছে। এই সংকট আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে জনস্বাস্থ্য একটি চলমান প্রক্রিয়া। এটি একবার সফল হলেই চিরস্থায়ী হয়ে যায় না। যদি নিয়মিত টিকাদান নিশ্চিত করা যায়, স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা যায় এবং মানুষকে সচেতন করা যায়, তাহলে হাম আবারও নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব। নইলে এই রোগ ভবিষ্যতে আরও বড় আকারে ফিরে আসতে পারে।
















