রহস্য গল্প : ওয়েস্ট মেসা মার্ডারস (সত্য ঘটনা অবলম্বনে)
২ ফেব্রুয়ারি,২০০৯ :
সোনালি লাল সূর্যটা প্রায় মধ্যগগন ছুঁই ছুঁই ; ওয়েস্ট মেসা মরুর বালুকাময় প্রান্তরের উপরে হেঁটে চলেছেন মধ্যবয়স্কা এক নারী – সাথে তার শখের পোষা কুকুরছানা। তপ্ত রৌদ্রের মাঝে কোথাও যে একটু জিরিয়ে নেওয়া যাবে তার তো কোন উপায়ই নেই,সঙ্গে যোগ হয়েছে মরুর দমকা হাওয়া। পায়ের তলায় বালুকণাগুলো যেন গলিত সোনা হয়ে আছে! মাথার উপর দিয়ে হঠাৎ প্রায় আধ ডজনখানেক বিদঘুটে কালো চেহারার শকুন উড়ে যায়।তাদের ডানা ঝাপটানোর পতপত আওয়াজে আশপাশটা খানিক সময়ের জন্য নীরবতা ভেঙ্গে জেগে উঠে।
তারপর….তারপর,আবারও সব নিশ্চুপ।শুধু উড়ে যাওয়া কালো শকুনগুলোর ছায়াগুলো দূরে ধীরে ধীরে একটা কালোবিন্দুতে পরিণত হয়।আরও দূরে গিয়ে দূরের দিগন্তে মিলিয়ে যায় ওটা।সেদিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে কিছু সময় ঘেউ ঘেউ করতে থাকে কুকুরছানাটা।তারপর আবারও সব নিশ্চুপ।মুখ বেয়ে নেমে আসা ঘামের বিন্দুগুলো নিচের উত্তপ্ত বালিতে পড়তেই হারিয়ে যায়। কিন্তু,সেদিকে কোনো ভ্রুক্ষেপই নেই মহিলার! বেশ দূরে একটা ঢিবির মত জায়গা দেখা যাচ্ছে;ওখানে গিয়েই সামান্য জিড়িয়ে নিয়ে আবারো পথ চলতে হবে।বেশ দ্রুত পদক্ষেপে সেদিকটায় এগিয়ে যেতে থাকেন তিনি; সাথে কুকুরছানাটাও। এখনো বেশ খানিকটা পথ বাকি।
গত পঁয়ত্রিশ মিনিট ধরে ঢিবিটার নিচে হেলান দিয়ে, পা দুটো টেনে প্রায় আধশোয়া হয়ে বসে আছেন মিস মেক্সা। ঢিবিটাকে আসলে ঢিবি বলা ঠিক হবে না;দূর থেকে যেটাকে দেখে ঢিবি ভেবেছিলেন সেটা আসলে বিশাল একটা পাথরখন্ড।মরুভূমির বেশ খানিকটা মাটি দেবে গেছে এই পাথরখন্ডটার নিচে পড়ে। পাথরখন্ডটার ছায়ায় এখানে সেখানে ছড়ানো ছিটানোভাবে বেশকিছু কাঁটাগুল্ম আর ক্যাকটাস সবুজ হয়ে বেড়ে উঠেছে। বর্ষা মৌসুমে এটা নিশ্চয়ই আনন্দভ্রমনের একটা নিখাদ স্পট হয়ে উঠতে পারে! কিন্তু,এই মুহূর্তে নিশ্চয়ই নয়! ব্যাপারটা ভাবতে ভাবতেই উঠে দাঁড়ায় মেক্সা। প্রিয় কুকুরছানাটাকে আশপাশে দেখতে না পেয়ে কেমন যেন মোচড় দিয়ে উঠে তার ভিতরটা। এতক্ষণ প্রাণীটার কথা বেমালুম ভুলে গিয়েছিলেন মেক্সা;খুঁজতে খুঁজতে পাথরখন্ডটার উপর দিকে উঠে যান।পাথরখন্ড থেকে বেশ খানিকটা দূরেই যে পথে তারা এসেছিলেন ঠিক সেদিকটায় কিছু একটা নিয়ে টানাহেঁচড়া করতে দেখা যায় কুকুরছানাটাকে। স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেন মেক্সা।
বেশ খানিকটা সময় কুকুরছানাটার নাম ধরে ডাকাডাকির পরও সেটার সাড়া দেওয়ার কোনো লক্ষণ না দেখে অগত্যা সেদিকে পা বাড়ান মেক্সা। কুকুরছানাটার হঠাৎ এমন অবাধ্য আচরণে একেবারে হতবাকই হয়ে যায় সে।
কাছে যেতেই দেখতে পান,বেশ পুরোনো শুকনো হাড় জাতীয় কিছু একটা নিয়ে টানাহেঁচড়া করছে সে। মরা কোনো বাইসন কিংবা নেকড়ের হাড় হবে হয়ত।মরুর পরিবেশে এটা বেশ স্বাভাবিকই একটা ইনসিডেন্ট বলা যেতে পারে।কুকুরছানাটাকে অগত্যা বেশ ক’টা গালাগাল দিয়ে যখনই পেছনে ফিরবেন মেক্সা ঠিক তখনই মরুর একটা দমকা হাওয়ায় হাড়টার বাকি অংশের উপর থেকে বালির স্তুপ সরে যেতেই যেটা দেখতে পেলো মেক্সা সেটার জন্য একেবারেই প্রস্তুত ছিলো না সে।তাল সামলাতে না পেরে দু’পা পিছিয়ে গিয়ে তিনবার যিশুর নাম নেয়।তারপর চোখ বুজে বুকে ঝোলানো ক্রুশটায় তিনবার চুমু খায়।আস্তে ধীরে চোখ মেলে সামনের বালিয়াড়িতে পড়ে থাকা বস্তুটার দিকে প্রচন্ড ভয় নিয়ে তাকায় মেক্সা।নাহ,যা দেখছে তা দুঃস্বপ্ন নয়;একেবারে দিবাস্বপ্নের মত বাস্তব।কিন্তু,এ যেন দুঃস্বপ্নকেও হার মানায়! একটা মৃত মানুষের কঙ্কাল কাঠামো;এক পলকেই বুঝে যায় মেক্সা। বেশ পুরোনো,স্থানে স্থানে ক্ষয়ে গিয়ে দেহের কয়েকটা অঙ্গ নেই হয়ে গিয়েছে।কিছু বুঝে উঠতে না পেরে কুকুরছানাটাকে তক্ষুনি কোলে তুলে যিশুর নাম জপতে জপতে ফিরে চলেন মেক্সা,চোখে-মুখে প্রচন্ড ভয় যেন পিছনে ফিরলেই বুঝি কিছু একটা দেখে ফেলবেন! মরুর বালিতে প্রায় টলতে টলতে জায়গাটা ত্যাগ করেন মেক্সা।
ততক্ষণে আরো একটা দমকা হাওয়া আসে, কঙ্গাল কাঠামোটা তাতে আবারও আড়াল হয়ে যায় বালির স্তুপের নিচে।
……
মধ্য-জুন,২০০৫ :
গত ক’মিনিট ধরেই ডেস্কের পাশের খোলা জানালাটা দিয়ে একদৃষ্টে বাইরে তাকিয়ে আছেন এলবাকার্কি পুলিশ ডিটেকটিভ আইডা লোপেজ।খুব মনোযোগ সহকারে কিছু একটা ভাবতে ভাবতে হঠাতই আনমনা হয়ে বাইরের এলবাকার্কি হাইওয়ের দিকে তাকিয়ে আছেন গত ক’মিনিট।মাথার উপরে ঘুরতে থাকা ফ্যানটার হালকা বাতাসে ডেস্কের উপর রাখা নীলরঙা ফাইলটার পাতাগুলো উল্টে যেতে থাকে এক এক করে।সম্বিৎ ফিরে পেয়ে ফাইলটার উলটে যাওয়া পাতাগুলোর উপর চোখ রাখে লোপেজ – যেন এই ফাইলটা একটা ওয়াইজা বোর্ডের মতোই রহস্যাবৃত,বরঞ্চ কোনো অংশে কম নয়! গত কয়েকমাস ধরে হাইওয়ের পাশের বিদ্যুতের খুঁটিগুলোতে যে “Missing!” লিফলেটগুলো লাগানো হচ্ছে তা যেন বিদ্যুৎ বিলের মতোই হুহু করে বেড়ে চলেছে! এই মিসিং ফাইলগুলোই এই মুহূর্তে ডেস্কের উপর পড়ে থেকে বারবার পীড়া দিয়ে যাচ্ছে লোপেজকে।এক বা দু’টো নয়,গত দু’বছরে প্রায় দশটা মিসিং ফাইল জমা হয়েছে! সমাধান করা যায়নি একটিরও।কিন্তু অদ্ভুতভাবে,এই দশজনই কোনো না কোনোভাবে যুক্ত ছিলো ড্রাগ এবং প্রস্টিটিউডের সাথে এবং প্রত্যেকেই ১৫-৩২বছর বয়স্কা নারী।ব্যাপারটা এমন অবস্থায় গিয়ে ঠেকেছে যে,এটাকে টার্গেট সিরিয়াল কিলিং বাদে অন্যকিছু যেন ভাবতেও ভুলে গেছেন লোপেজ।গত কয়েকমাসে শহরের সম্ভাব্য প্রায় সবকটা বার,হোটেল,ক্যাসিনোতে তন্নতন্ন করে খুঁজেও কোনো আলামত জোগাড় করতে পারেনি এলবাকার্কি পুলিশ ডিপার্টমেন্ট। জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে প্রায় সব বার,ক্যাসিনো মালিককে,সাথে সন্দেহজনক সকল অপরাধীকে যারা আগেও ড্রাগ কেলেঙ্কারির সাথে যুক্ত ছিলো।চেক করা হয়েছে বার-ক্যাসিনোগুলোর সার্ভেলেন্স ক্যামেরা।এছাড়াও চেক করা হয়েছে এলবাকার্কির প্রায় সবগুলো হোটেলের রিসিপশন লিস্ট।পাওয়া যায়নি সন্দেহজনক কোনো আলামত। এদিকে,পুলিশ কমিশনারের তরফ থেকে বেশ ক’গাদা গালাগাল শোনা তো প্রতিদিনকার রুটিন হয়ে গেছে বলা চলে!কিন্তু,কিছুতেই যেন কিছু সমাধান করা যাচ্ছে না।রাগ সামলে উঠতে না পেরে হাত মুঠোবদ্ধ করে লোপেজ।তারপর ডেস্কের উপর একটা ঘুষি দিয়ে ফাইলটা সেই অবস্থায় রেখেই উঠে পড়ে।চেয়ারের উপর রাখা হ্যাটটা মাথায় পড়ে নিয়ে দ্রুত পদক্ষেপে বাইরে বেরিয়ে আসে।তারপর নিজের শেভরোলেট ইম্পালা এলএসে চেপে বসে।একবার চাবি ঘুরাতেই স্টার্ট নিলো সেটা।ধীরে ধীরে এলবাকার্কি হাইওয়ে ধরে এগিয়ে যায় সেটা।তারপর ডানে মোড় ঘুরতেই দূরের ছোট ছোট বিল্ডিং গুলোর পেছনে হারিয়ে যায় ইম্পালাটা।
….
২ ফেব্রুয়ারি,২০০৯ :
সূর্যটা তখনো পশ্চিমাকাশে ঢলে পড়ে নি।সন্ধ্যার বেশ খানিকটা সময় আগে হন্তদন্ত পায়ে এলবাকার্কি পুলিশ ডিপার্টমেন্টে প্রবেশ করেন মিস মেক্সা।দৌড়ে আসার কারণে বেশ হাঁপিয়েই গেছেন; বুকের উপর শক্ত করে জড়িয়ে ধরে রাখা কুকুরছানাটার গায়ে এসে পড়ছে কপাল বেয়ে গড়িয়ে পড়া বিন্দু বিন্দু ঘাম।উল্টোদিকের চেয়ারে বসে এতক্ষণ মিস মেক্সাকে পরখ করছিলেন পুলিশ চিফ মাইকেল গিয়ার।হাতের ইশারায় মিস মেক্সাকে বসার জন্য ইঙ্গিত করতেই ধপ করে সামনের চেয়ারটায় বসে পড়েন মেক্সা।তীক্ষ্ণ চোখে মেক্সার দিকে তাকিয়ে ডেস্কের উপর রাখা গ্লাসটায় পানি ভরে নেন গিয়ার।তারপর,ডেস্কের উপর দিয়েই গ্লাসটা ঠেলে দেন মেক্সার উদ্দেশ্যে।সাথে সাথেই গ্লাসটা হাতে তুলে নেন মেক্সা,তারপর ঢকঢক করে এক নিশ্বাসেই পুরোটা পানি পান করেন।শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করেন গিয়ার।
তারপর নিজেই প্রশ্ন তুলেন,”কি ঘটেছে পুরোটা খুলে বলুন,তবে অবশ্যই তার আগে আপনার নাম এবং ঠিকানাটা বলে শুরু করবেন।” ডেস্কের উপর থাকা পেপার আর কলম নিয়ে মেক্সার দিকে মুখ তুলে তাকান গিয়ার।
বেশ কিছুক্ষণ আমতা আমতা করতে থাকেন মেক্সা,উত্তজেনায় যেন প্রায় দমবন্ধ হয়ে আসছে তার! কিছুসময় চুপচাপ থেকে মেক্সাকে জিরিয়ে নেওয়ার সুযোগ দেন গিয়ার।বেশ খানিকটা পর,নিজের নাম এবং এড্রেস জানিয়ে ঘটনা বর্ণনা করতে শুরু করেন মেক্সা।ওয়েস্ট মেসা মরুর বালিয়াড়িতে পড়ে থাকা সেই কঙ্কাল কাঠামোটার বিবরণ দিয়েই গলায় ঝুলে থাকা ক্রুশটা হাতের মুঠোয় নিয়ে আবারো চুমু খেতে থাকেন।
ব্যাপারটা শুনে বেশ অবাকই হয়ে যান গিয়ার।ভ্রু কুঁচকে মেক্সার দিকে তাকান,যেন কোনো এক পাগল বসে আছে তার সামনে! জিজ্ঞেস করেন,”আপনি যে কঙ্কাল কাঠামোটা দেখেছেন সেটা আসলেই কোনো মানুষের কিনা এব্যাপারে আপনি ঠিক কতখানি নিশ্চিত?”
একটুও না ভেবে পরমুহূর্তেই মেক্সা চেঁচিয়ে বলে উঠে,” স্বয়ং যিশু সাক্ষী,আমার চোখ কখনো ভুল দেখে না।যদি আমায় বিশ্বাস না হয় তাহলে একবার নিজে গিয়েই দেখে আসুন না!”
“ওকে,আপনি আমাদের নিয়ে চলুন সে জায়গাটায়।” বলেই চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াতে উদ্ধত হন গিয়ার।
“নাহ,আমার পক্ষে সম্ভব নয় দ্বিতীয়বার ওই ভয়ংকর দানবটার মুখোমুখি হওয়া! আপনি চাইলে আমি জিপিএসে এক্সেট লোকেশনটা দেখিয়ে দিতে পারি।” কুকুরছানাটার গায়ে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলে মেক্সা।
“দ্যান প্লিজ কাম উইথ মি,মিস মেক্সা” উঠে দাঁড়িয়ে বলেন চিফ গিয়ার।
চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ান মেক্সা। ঘুরে দাঁড়িয়ে গিয়ারকে অনুসরণ করেন।
একটু পরই এলবাকার্কি পুলিশ ডিপার্টমেন্টের মূল সদর দরজা পার হয়ে হাইওয়ের উপর এসে দাঁড়ায় দু’জন।তারপর গিয়ারের শেলভি জিটি-২৫০ তে চড়ে বসে।হাইওয়ে ধরে নিউ মেক্সিকো স্যাটেলাইট সেন্টারের উদ্দেশ্যে এগিয়ে যায় ওটা….
……
৫ই ফেব্রুয়ারি,২০০৯ :
এই মুহূর্তে নিউ মেক্সিকোর ইতিহাসের সবচাইতে বিস্তৃত কিলিং স্পটের উপর দাঁড়িয়ে খোঁড়াখুঁড়ির কাজের তদারকি করছেন পুলিশ চিফ মি. গিয়ার,তার পাশেই দাঁড়িয়ে বিস্ময়ে হা হয়ে খোঁড়াখুঁড়ি দেখছেন নিউ মেক্সিকোর পুলিশ কমিশনার মি.এলবার্তো।প্রত্যেকটা হাড় মাটি থেকে তুলে নিয়ে পাশাপাশি সাজিয়ে রাখা হচ্ছে।বেশ অনেকদিনের পুরোনো বলে ক্ষয়ে গিয়ে কঙ্কাল কাঠামো থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে আছে সেগুলো।খোঁড়াখুঁড়ি চলাকালীন আশপাশের জায়গাগুলো ঘুরে দেখতে লাগলেন গিয়ার আর এলবার্তো।পুরো জমিটা পরিত্যক্ত হয়ে আছে প্রায় বেশ ক’বছর ধরে।মূলত এলবাকার্কি এবং তার আশপাশের ছোট ছোট ডেভেলপমেন্ট কোম্পানিগুলো স্থানীয়দের কাছ থেকে এই জমিগুলো কিনে নিয়েছিলো।কিন্তু ওই কিনে নেওয়া পর্যন্তই; হাত দেওয়া হয়নি কোনো ডেভেলপমেন্টের কাজে।ছোট ছোট বাউন্ডারিগুলো মরুভূমির বালিতে প্রায় ঢাকা পড়ে আছে।প্রতিটা লটের মাঝে টানানো সাইনবোর্ডে অধিকৃত কোম্পানিগুলোর নাম,ঠিকানা আর সেল নাম্বার লিখে রাখা হয়েছে।পকেট থেকে প্যাড আর কলম বের করে সেগুলো নোট করে রাখতে শুরু করেন গিয়ার।কখন কাকে কাজে লাগে তার তো কোনো নিশ্চয়তা নেই! এত বড় একটা মার্ডার কেসের রহস্যের জট কিভাবে সমাধান করবেন সেটা চিন্তা করতে করতেই খোঁড়াখুঁড়ির দিকে এগিয়ে যান দুজন।অস্থিরতায় কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমতে শুরু করেছে মি.গিয়ারের….
খোঁড়াখুঁড়ির কাজ প্রায় বেশ কিছুসময় আগেই শেষ হয়ে গেছে।হাতে একটা গ্লাভস পড়ে নিয়ে পাতলা পলিমারের কালো পলিথিন ব্যাগে হাড়গুলো মুড়ে রাখতে শুরু করেছেন মি.গিয়ার।এক এক করে প্রায় এগারোটা পলিথিন ব্যাগে কঙ্কালগুলো সাবধানে সাজিয়ে রাখতে রাখতেই হঠাৎ কিছু একটা মনে পড়ে গেলো গিয়ারের।ব্যাপারটা মনে পড়তেই নিজের অজান্তে অস্ফুট স্বরে “জিসাস ক্রাইস্ট” বলে চেঁচিয়ে উঠেন গিয়ার।চারবছর আগের সেই মিসিং ওমেনগুলোর হাড় নয়তো এগুলো! উত্তেজনায় প্রায় দমবন্ধ হয়ে আসছে গিয়ারের।তারপর,তড়িঘড়ি করে ফরেনসিক ডক্টর স্যামুয়েলের উদ্দেশ্যে ব্যাগগুলো নিয়ে রওয়ানা দেন।প্রায় আধঘন্টার মাঝেই গাড়ি হসপিটালের মুখে পৌঁছে যায়।গাড়ি থেকে নেমেই ড.স্যামুয়েলের উদ্দেশ্যে হসপিটালের করিডোর ধরে উর্ধ্বশ্বাসে ছুটতে থাকে গিয়ার – উত্তেজনায় আরো দ্রুততর হয় শ্বাস-প্রশ্বাস….
….
১১ই এপ্রিল, ২০০৯ :
যে আশঙ্কাটা করেছিলেন মি.গিয়ার,অটোপসি রিপোর্ট হাতে পাবার পর সেই আশঙ্কাটাই যেন হাতে নিয়ে বসে আছেন! চারবছর আগের মিসিং রিপোর্টের দশজনের লিস্টটাতে যোগ হয়েছে আরো দুজন – ১৫ বছর বয়সী আফ্রিকান এমেরিকান ওমেন সিলানিয়া এডওয়ার্ডস আর তার আনবর্ন বেবি।কিন্তু,এই সিলানিয়া এডওয়ার্ডসের নামে কোনো মিসিং রিপোর্টই করা হয়নি।বাকি প্রত্যেকের নামেই আছে একটা করে মিসিং রিপোর্ট।চেয়ার ছেড়ে পুরোনো আলমারিটার সামনে গিয়ে দাঁড়ায় গিয়ার।দরজার কপাটটা টেনে খুলতেই ভেতর থেকে হুড়মুড় করে গিয়ারের গায়ে এসে পড়ে গাদাগাদা ফাইলগুলো।কোনোরকম তাল সামলে ফাইলগুলোর নিচে পড়ে যাওয়া ঠেকায় গিয়ার।তারপর,দ্বিতীয় তাক থেকে খুঁজে বের করে সেই নীলরঙা ফাইলটা।ফাইলটা হাতে নিয়ে উল্টোতে উল্টোতেই গিয়ার চেয়ারে এসে বসেন।সব ডিটেইলস এক এক করে পড়ে গিয়ার একটা ব্যাপার খুব ভালোভাবেই বুঝতে পারেন – এলবাকার্কিতে প্রতিবছর যে “অ্যানুয়াল স্টেট ফেয়ার” হয় সেটাই মূলত এসব “কিলিং আফটার রেইপ” এর জন্য দায়ী।কারণ,এই অ্যানুয়াল ফেয়ারই প্রচুর পরিমাণে সেক্স ওয়ার্কারদের আকৃষ্ট করে।ফাইলটা নাড়াচাড়া করতে করতেই এসব কথা ভেবে হঠাৎ কেমন যেন আনমনা হয়ে পড়েন গিয়ার।তারপর,ডেস্কের পাশের জানলা দিয়ে বাইরে একদৃষ্টে তাকিয়ে থেকে চারবছর আগে এই ডেস্কেই বসা লোপেজের কথা ভাবতে থাকেন।এতকিছুর পরও,এলবাকার্কি পুলিশের একের পর এক ব্যর্থতার দায়ভার কিভাবে সামলেছিলেন লোপেজ! ব্যাপারটা ভাবতে ভাবতেই একটা দীর্ঘশ্বাস বের হয়ে আসে গিয়ারের চোয়াল বেয়ে।
১৭ই জানুয়ারি, ২০১০ :
নিউ মেক্সিকো স্যাটেলাইট সেন্টারে বসে ওয়েস্ট মেসা এরিয়ার ২০০৫-০৬ সালের স্যাটেলাইট ফুটেজগুলো খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে থাকেন গিয়ার।একটা ফুটেজে এসে হঠাৎ কিছু একটা দেখতে পান।তারপর ফুটেজটা জুম ইন করে কম্পিটার স্ক্রিনের দিকে আরো একটু ঝুঁকে বুঝতে পারেন,যে ছাপগুলো দেখতে পাচ্ছেন গিয়ার সেগুলো আসলে বেশ কয়েকটা টায়ার ট্র্যাক।এই ট্র্যাকগুলো ওয়েস্ট মেসার সেই পরিত্যক্ত লট থেকে শুরু হয়ে আড়াই মাইল দূরের “মন্টায়া ভিলা”তে গিয়ে শেষ হয়েছে।উত্তেজনায় দমবন্ধ হয়ে আসে গিয়ারের।হাত মুষ্টিবদ্ধ করে চেয়ারের হাতলে একটা ঘুষি দিয়ে বলে উঠেন,”ইউ ক্যান্ট স্কেইপ ফ্রম মি,বিচ!” কিন্তু,তারপরই মন্টায়া ভিলার মালিক লরেঞ্জো মন্টায়ার খুন হওয়ার ব্যাপারটা মাথায় আসতেই গিয়ারের উজ্জ্বল চোখদুটো দপ করে নিভে যায়। এই লরেঞ্জো মন্টায়াকে বেশ ভালোভাবেই চেনেন গিয়ার।মূলত,সেইসময়ের লরেঞ্জো মন্টায়ার খুনের কেসটার দায়িত্বে গিয়ারই ছিলেন।ড্রাগ কেলেঙ্কারি আর বেশ কয়েকটা ধর্ষণের পেছনে সম্পৃক্ততার জেরে সেনাবাহিনী থেকে বহিষ্কৃত হয়েছিলো লরেঞ্জো।ড্রাগ আর নারীদেহের প্রতি চরমতম আকর্ষণ ছিলো এই লরেঞ্জো মন্টায়ার।২০০৬ সালের ১৩ই ডিসেম্বর এক টিনেজ গার্লকে নিজের ট্রেইলারে ধর্ষণের পর শ্বাসরোধে হত্যা করে লরেঞ্জো।তার ঠিক তিনদিন পরই মন্টায়া ভিলায় লরেঞ্জোর নগ্ন মৃতদেহ আবিষ্কার করে গিয়ার আর তার সহকর্মীটা।বুকের ফুটোগুলো দেখে বুঝতে পারে – মূলত গুলিবিদ্ধ করেই খুন করা হয়েছিলো লরেঞ্জোকে।কিন্তু,গিয়াররা লরেঞ্জোর লাশটাকে যে অবস্থায় গ্রাউন্ড ফ্লোরে পড়ে থাকতে দেখেছিলেন,তাতে সেখানে উপস্থিত সব পুলিশকর্মীর গা গুলিয়ে উঠেছিলো।লরেঞ্জোর যৌনাঙ্গটা কেটে তার মুখে ঢুকিয়ে রাখা হয়েছিলো! আর কাটা যৌনাঙ্গের স্থান থেকে তখনো পর্যন্ত রক্ত ঝরছিলো।বোঝাই যাচ্ছিলো,খুনী লরেঞ্জোর ওইসব অপকর্মে যথেষ্ট রেগে গিয়েছিলো।ব্যাপারটা চিন্তা করলেই আজও গা গুলিয়ে উঠে গিয়ারের।কিন্তু,তখনো পর্যন্ত খুনের মোটিভ কী তা জানতে পারেনি এলবাকার্কি পুলিশ।পরে তদন্তে বের হয়ে আসে যে,ওই টিনেজ গার্লটার খুনের প্রতিশোধ নিয়েছিলো তার বয়ফ্রেন্ড।
লরেঞ্জোর ব্যাপারটা ভাবতে ভাবতেই চিন্তিত মুখে স্যাটেলাইট সেন্টার থেকে বের হয়ে নিজের শেলভি জিটিতে এসে বসে গিয়ার।তারপর,ফাঁকা হাইওয়ে ধরে এলবাকার্কির উদ্দেশ্যে এগিয়ে চলে গাড়িটা।প্রচন্ড হতাশায় হাত দিয়ে গিয়ার তার স্টিয়ারিংটায় সজোরে কয়েকবার আঘাত করে।এতে বেশ কয়েকবার “কিঁক-কিঁক” শব্দ করে উঠে গাড়িটা।ফাঁকা রাস্তায় এগিয়ে চলা একটা পুলিশ ভ্যানকে এভাবে হর্ণ বাজাতে দেখায় রাস্তার পাশ দিয়ে হেঁটে চলা মানুষগুলো কয়েকমুহুর্তের জন্য স্থির হয়ে যায়।তারপর,গিয়ারকে উদ্দেশ্য করে গালাগাল দিতে দিতেই আবারো নিজেদের গন্তব্যের দিকে পা বাড়ায় তারা।সেদিকে ভ্রুক্ষেপও করে না গিয়ার – স্টিয়ারিংটা আরো সজোরে চেপে ধরে…..
২১মে, ২০১০:
রাত ২:৩১টা।গিয়ারের সেলফোনটা বেশ অনেক্ষণ ধরেই রিং হয়ে যাচ্ছে।১০৩ ডিগ্রী জ্বর নিয়ে বেহুঁশের মতো ঘুমাচ্ছে গিয়ার।সেলফোনের রিংয়ের শব্দে ঘুমটা ভেঙ্গে যায় ওর।হাতড়ে হাতড়ে বিছনার পাশের ডেস্ক থেকে ঘুম ঘুম চোখে সেলফোনটা হাতে নিয়ে কল রিসিভ করতেই বিপরীত পাশ থেকে এলবাকার্কি পুলিশ সুপার মার্কেজের হাসিখুশি কণ্ঠস্বরটা ভেসে উঠে।এই ঘুমন্ত অবস্থায়ও মার্কেজের গলাটা চিনতে একটুও দেরি হয়নি গিয়ারের।
“শুরুতেই ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি এত রাতে ফোন দিয়ে তোমাকে ডিস্টার্ব করছি বলে” বলে উঠে মার্কেজ,”আপাতত কেমন বোধ করছো,গিয়ার? জ্বর কি একটু কমেছে?”
“এত রাতে এসব প্রশ্ন করা যদি তোমার ফোন করার উদ্দেশ্য হয়ে থাকে তাহলে আমি ফোন রাখছি!” বিরক্তির স্বরে বলে গিয়ার,”তোমার সাথে হাসি-তামাশা করার মুড আমার এই মুহূর্তে নেই!”
“হা হা হা,তাহলে একটা গার্লফ্রেন্ড জুটিয়ে নিলেই তো পারো।সময়ে অসময়ে সবসময় তোমার পাশে থাকবে সে!” বিপরীত পাশ থেকে হাসতে হাসতে বলে উঠে মার্কেজ।
“ওহ,মার্কেজ! দ্বিতীয়বার তোমার মুখে ওই কথাটা শুনলে আমি সত্যি সত্যিই কিন্তু এইবার তোমাকে জেলের লকাপে পুরবো – এই বলে দিলাম।” দাঁত কিড়মিড় করে বলে উঠে গিয়ার।
মার্কেজের সাথে গিয়ারের সম্পর্কটা শুরু হয় সেই মিডলস্কুলে পড়ার সময়।এতবছর পরে এসেও তাদের সম্পর্কটা এতটুকুও মিইয়ে যায়নি।সম্পর্কটা এতবছর পরও ঠিক আগের মতোই আছে – যেমনটা মিডলস্কুলে ছিলো।এর পেছনে অবশ্য মার্কেজের অবদান বেশি বলেই মনে করে গিয়ার।মার্কেজ মূলত হাসিখুশি আর আমুদে স্বভাবের।পরিচয় হবার পর থেকে গিয়ার মার্কেজকে আজ পর্যন্ত কখনো মন খারাপ করে থাকতে দেখেছিন কিনা সন্দেহ।শুধু একবার গ্রেড ইলেভেনের পরীক্ষায় ম্যাথম্যাটিকসে অস্বাভাবিক কম নাম্বার পাবার পর মার্কেজকে খানিকটা চিন্তিত হয়ে পড়তে দেখেছিলেন গিয়ার।কিন্তু,তার পরদিনই অবশ্য স্কুলের মাঠে উদাম হয়ে ফুটবল খেলতে দেখা যায় মার্কেজকে – মুখে পাঁচ-পাঁচটা আঙ্গুলের দাগ একেবারে লাল হয়ে জ্বলছিলো।অন্যদিকে,গিয়ার ঠিক তার উল্টোটা – গাঁট্টাগোঁট্টা আর খিটখিটে স্বভাবের।সামান্য কোনো ব্যাপারকেই সিরিয়াসলি নিয়ে ফেলে গিয়ার।অবশ্য,এই স্বভাবটা মার্কেজকে সাথে নিয়ে বহুবার সমাধানের চেষ্টা করেও কোনো ফল হয়নি।শেষ পর্যন্ত হালই ছেড়ে দিয়েছেন গিয়ার!
“আচ্ছা,বাদ দাও সেসব কথা।” গলার স্বর পরিবর্তন করে বলে মার্কেজ,”ওয়েস্ট মেসা সিরিয়াল কিলিংয়ের ব্যাপারে বেশ অদ্ভুত একটা খবর পেয়েছি আমি।আমার কেন যেন মনে হচ্ছে,ওই সিরিয়াল কিলিংটার জোসেফ ব্লিয়ার হাত আছে।”
“জোসেফ ব্লিয়া!” বিস্ময়ের সুরে বলে উঠে গিয়ার,”ব্লি-য়া-য়া-য়া! মানে সেই মিডস্কুল রেপিস্ট যে কিনা নাইনটিন এইটিজে এই এলবাকার্কিকে ধর্ষণের নগরী বানিয়ে ফেলেছিলো! কিন্তু,কেন তোমার এমন মনে হচ্ছে – যে এই মার্ডারগুলোর পেছনে ব্লিয়ার কোনো যোগসূত্র আছে?
“আমার এক সহকর্মী গত দুদিন আগে ওয়েস্ট মেসার বেশ কাছের একটা নার্সারিতে এই ব্যাপারে খোঁজ নিয়েছিলো….” বলতে থাকে মার্কেজ,”ওই নার্সারির সবচে বয়োজ্যেষ্ঠ পরিচর্যাকারীই তাকে এ ব্যাপারে বলেছিলো।”
“ইন্টারেস্টিং!” বিছনায় উঠে বসতে বসতে বলে গিয়ার,”তারপর?”
“ওই পরিচর্যাকারী তাকে জানিয়েছিলো যে,২০০৪-০৫ সালের দিকে ব্লিয়া নাকি প্রায় প্রতিদিনই ওই নার্সারিতে যেতেন।এতে ব্লিয়ার সঙ্গে নাকি বেশ খাতিরই হয়ে গিয়েছিলো ওই লোকের।কিন্তু,২০০৫-০৬ এর দিক থেকে ব্লিয়া নাকি আর একবারও ওইদিকে যায়নি।বুঝতো পারছো গিয়ার,আমি কি বুঝাতে চেষ্টা করছি? হ্যালো, গিয়ার?”
এতক্ষণ মার্কেজের কথা শুনতে শুনতে কেমন যেন অন্যমনষ্ক হয়ে গিয়েছিলো গিয়ার,ইতস্তত করে বলে উঠে,”ওহ,হুম! বুঝতে পেরেছি।”
“তাহলে ভালো বোধ করলে কাল সকালে একবার এদিকে এসো।সামনা-সামনি বসে আলাপ করা যাবে এব্যাপারে।” বিপরীত পাশ থেকে উৎসাহ নিয়ে বলে মার্কেজ।
“আচ্ছা,মার্কেজ? এই কেসটার কাছে বারবার যখন আমরা হেরে যাচ্ছি তাহলে কেন এই কেসটার সাথে আবারো রেসিং ট্র্যাকে নামতে চাচ্ছো? আমি সত্যিই এই কেসটার পেছনে আর সময় ব্যয় করতে চাই না….” প্রচন্ড হতাশা নিয়ে কথাটা বলে উঠে গিয়ার।
বিপরীত পাশ থেকে লম্বা একটা দীর্ঘশ্বাস শোনা যায়।ফোনটা কেটে যেতেই আবারো চারিদিকের পরিবেশে নিস্তব্ধতা নেমে আসে।ঘড়ির কাঁটায় টিক-টিক করতে করতে বেড়ে চলে দীর্ঘ-ক্লান্ত আর অস্বস্তিকর আরো একটা রাত।
…..
নোট: নিউ মেক্সিকোর ইতিহাসের সবচাইতে বড় এই “ওয়েস্ট মেসা মার্ডারস” কেসটা আজও সোলভ করতে পারেনি নিউ মেক্সিকো পুলিশ।এই “আনসোলভড মিস্ট্রি”টার ফাইল আজও ওপেন রয়েছে।অপরাধীকে শনাক্ত করতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছে পুলিশ।রিওয়ার্ড হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে ১ লাখ মার্কিন ডলার।মূলত এই মার্ডার কেসটাকেই গল্পের আকারে সাজিয়ে লিখতে চেষ্টা করেছি আমি।তাতে মিস মেক্সা(যেহেতু এই মার্ডার কেসে তিনি তার নাম জড়াতে চান নি) আর পুলিশ সুপার মার্কেজের নাম আমি ছদ্মনাম হিসেবে ব্যবহার করে কেসটার উত্তেজনা ধরে রাখতে চেষ্টা করেছি।আশা করি,তাতে ঘটনা বর্ণনায় উত্তেজনাপূর্ণ আর রহস্যময় এই মার্ডার কেসটার চিত্র একটুও বিবর্ণ হয়নি।











