অন্তর্বর্তী সরকারের সবচেয়ে বড় অর্জন ‘জুলাই সনদ’ বলে মন্তব্য করেছেন প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি বলেছেন, গণভোটে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতার মাধ্যমে জনগণ জুলাই সনদ বাস্তবায়নের পক্ষে রায় দিয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই এই সনদ বাস্তবায়িত হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
সোমবার (১৬ ফেব্রুয়ারি) রাতে জাতির উদ্দেশে বিদায়ী ভাষণে তিনি বলেন, “অন্তর্বর্তী সরকারের ছোটবড়, ভালো-মন্দ অনেক কিছুই মানুষ ভুলে যেতে পারে, কিন্তু জুলাই সনদের কথা জাতি কখনো ভুলবে না।” সনদ প্রণয়ন ও গণভোটে পাস করাতে সহযোগিতা করা রাজনৈতিক দল, সামাজিক সংগঠন ও অধিকার রক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান তিনি।
প্রবাসীদের ভোটাধিকার ও নির্বাচন
ড. ইউনূস বলেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রথমবারের মতো প্রবাসীদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। একজন প্রবাসী ভোটার যখন সামাজিক মাধ্যমে গর্বভরে নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন, তা একজন নাগরিক হিসেবে তাঁকে আনন্দিত করে বলে উল্লেখ করেন তিনি। ভবিষ্যতে আরও বেশি প্রবাসী অংশগ্রহণ করবেন—এমন প্রত্যাশাও ব্যক্ত করেন।
‘অমিত সম্ভাবনার বাংলাদেশ’
ভাষণে তিনি বলেন, বাংলাদেশ এখন আর শুধু সংকট মোকাবিলার গল্প নয়; এটি অমিত সম্ভাবনার দেশ। তরুণ প্রজন্মকে বিশ্বমানের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ দিয়ে বৈশ্বিক শ্রমবাজারে দক্ষ জনশক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি। জাপান, কোরিয়া, মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায় বাংলাদেশের দক্ষ কর্মশক্তির চাহিদা তৈরির সুযোগ রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের সমুদ্রসীমা ও বন্দরগুলোকে বিশ্ব অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক মানের বন্দর পরিচালনা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তির কাজও এগিয়েছে বলে জানান তিনি।
আইন ও প্রতিষ্ঠান সংস্কার
ড. ইউনূস দাবি করেন, গত দেড় বছরে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, গুম প্রতিরোধ ও পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশসহ ১৩০টি নতুন আইন ও ৬০০টি নির্বাহী আদেশ জারি করা হয়েছে। “আজ পুলিশ আর মারণাস্ত্র ব্যবহার করে না, আয়নাঘর নেই, গুমের সংস্কৃতি বন্ধ হয়েছে”—এমন মন্তব্যও করেন তিনি।
তিনি আরও জানান, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩৪ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে এবং নতুন অর্থনৈতিক ভিত্তি তৈরি করা হয়েছে। আগের সরকারের আমলে ২৩৪ বিলিয়ন ডলার পাচারের অভিযোগ তুলে ধরে তিনি বলেন, “আমরা শূন্য থেকে শুরু করিনি, শুরু করেছি মাইনাস থেকে।”
পররাষ্ট্রনীতি ও সার্বভৌমত্ব
পররাষ্ট্রনীতিতে আত্মবিশ্বাসী অবস্থানের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শুল্কহার ৩৭ শতাংশ থেকে ১৯ শতাংশে নামানো হয়েছে। জাপানের সঙ্গে ঐতিহাসিক ‘ইপিএ’ চুক্তি এবং চীনের সঙ্গে তিস্তা নদী ব্যবস্থাপনা ও নীলফামারীতে আন্তর্জাতিক মানের হাসপাতাল স্থাপনের অগ্রগতির কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
দায়িত্ব হস্তান্তর
ভাষণের শেষাংশে ড. ইউনূস বলেন, “আজ আমি আনন্দের সঙ্গে নবনির্বাচিত সরকারের কাছে দায়িত্ব অর্পণ করে বিদায় নিচ্ছি।” বিজয়ী ও পরাজিত উভয় পক্ষকে অভিনন্দন জানিয়ে তিনি বলেন, হার-জিত গণতন্ত্রের সৌন্দর্য।
চব্বিশের অভ্যুত্থানের শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তিনি নতুন বাংলাদেশ গঠনের সংগ্রাম অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান। “আমরা রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব ছেড়ে গেলেও নতুন বাংলাদেশ গড়ার দায়িত্ব আমাদের সবার। জুলাই গণঅভ্যুত্থান যে দরজা খুলে দিয়েছে, তা যেন আর কখনো বন্ধ না হয়”—বলেন প্রধান উপদেষ্টা।
















