ইয়াসির বিন তালেব আবরার
বিশ্ব প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তনের যুগে প্রবেশ করেছে, যেখানে যোগাযোগ ব্যবস্থা প্রতিনিয়ত নতুন মাত্রা লাভ করছে। প্রথম প্রজন্মের অ্যানালগ নেটওয়ার্ক থেকে শুরু করে বর্তমানের পঞ্চম প্রজন্মের মোবাইল প্রযুক্তি। প্রতিটি ধাপ মানুষের জীবনযাত্রা, অর্থনীতি ও সামাজিক কাঠামোয় গভীর প্রভাব ফেলেছে। এখন বিশ্বজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ষষ্ঠ প্রজন্মের যোগাযোগ প্রযুক্তি বা ৬জি, যা আগামী দশকের ডিজিটাল বাস্তবতাকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করতে পারে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ৬জি প্রযুক্তি কেবল উচ্চগতির ইন্টারনেটের বিষয় নয়। এটি দেশের ডিজিটাল অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, কৃষি, শিল্পায়ন, নগর ব্যবস্থাপনা এবং প্রশাসনিক দক্ষতার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে। বর্তমানে বাংলাদেশে ৪জি নেটওয়ার্কই সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে এবং সীমিত পরিসরে ৫জি পরীক্ষামূলকভাবে চালু হয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর পূর্বাভাস অনুযায়ী ২০৩০ সালের পর ৬জি প্রযুক্তি বাণিজ্যিকভাবে চালু হতে পারে, ফলে বাংলাদেশকেও এখন থেকেই প্রস্তুতি গ্রহণ করতে হবে। প্রযুক্তি বিশ্লেষকরা মনে করেন, ৬জি প্রযুক্তির ডেটা গতি ৫জির তুলনায় কয়েক গুণ বেশি হবে এবং এটি ১০০ গিগাবিট প্রতি সেকেন্ড বা তারও বেশি গতিতে তথ্য আদান-প্রদান করতে সক্ষম হতে পারে। কিছু গবেষণায় এমনও বলা হয়েছে যে ভবিষ্যতে এটি টেরাবিট পর্যায়ের গতি অর্জন করতে পারে। এই উচ্চগতির পাশাপাশি ৬জি প্রযুক্তিতে বিলম্বের পরিমাণ প্রায় শূন্যের কাছাকাছি থাকবে, ফলে তাৎক্ষণিক যোগাযোগ সম্ভব হবে।
বাংলাদেশের মতো জনবহুল দেশে যেখানে অনলাইন সেবা ক্রমশ বাড়ছে, সেখানে এই প্রযুক্তি ডিজিটাল সেবাকে আরও নির্ভুল ও কার্যকর করে তুলতে পারে। বিশেষ করে ভিডিও কনফারেন্সিং, ক্লাউড কম্পিউটিং, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ভার্চুয়াল রিয়েলিটি এবং অগমেন্টেড রিয়েলিটি নির্ভর সেবা ৬জি প্রযুক্তির মাধ্যমে ব্যাপকভাবে সম্প্রসারিত হবে। শিক্ষা খাতে ৬জি প্রযুক্তি একটি বড় পরিবর্তন আনতে পারে। করোনাভাইরাস মহামারির সময় অনলাইন শিক্ষার গুরুত্ব বাংলাদেশে নতুনভাবে উপলব্ধি করা হয়েছে। তবে দুর্বল নেটওয়ার্ক, কম ব্যান্ডউইথ এবং সংযোগ সমস্যার কারণে অনেক শিক্ষার্থী সমানভাবে সুবিধা পায়নি। ৬জি প্রযুক্তি চালু হলে ভার্চুয়াল ক্লাসরুম আরও উন্নত হবে এবং শিক্ষার্থীরা ত্রিমাত্রিক মডেল, লাইভ ল্যাবরেটরি এবং আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষাসামগ্রী ব্যবহার করতে পারবে। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর মধ্যে বাস্তব উপস্থিতির মতো যোগাযোগ সম্ভব হবে, যা দূরশিক্ষাকে আরও কার্যকর করে তুলবে। স্বাস্থ্যখাতেও ৬জি প্রযুক্তি বিপ্লব ঘটাতে পারে।
বাংলাদেশের গ্রামীণ অঞ্চলে উন্নত চিকিৎসা সুবিধা সীমিত হওয়ায় অনেক রোগী সময়মতো চিকিৎসা পান না। ৬জি প্রযুক্তির মাধ্যমে দূরবর্তী চিকিৎসা, লাইভ ভিডিও কনসালটেশন, রিয়েল-টাইম রোগী পর্যবেক্ষণ এবং এআই ভিত্তিক রোগ নির্ণয় সহজ হবে। এমনকি দূরবর্তী অস্ত্রোপচারে সহায়তা দেওয়াও সম্ভব হতে পারে, যেখানে শহরের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক গ্রামীণ হাসপাতালের চিকিৎসককে তাৎক্ষণিক নির্দেশনা দিতে পারবেন। এছাড়া পরিধানযোগ্য স্মার্ট ডিভাইসের মাধ্যমে রোগীর স্বাস্থ্য তথ্য সরাসরি চিকিৎসকের কাছে পৌঁছে যাবে, ফলে দীর্ঘমেয়াদি রোগ ব্যবস্থাপনা সহজ হবে।
কৃষিখাতে ৬জি প্রযুক্তি বাংলাদেশের জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। দেশের বড় অংশের মানুষ কৃষির ওপর নির্ভরশীল। স্মার্ট সেন্সর, ড্রোন, স্বয়ংক্রিয় সেচ ব্যবস্থা এবং রিয়েল-টাইম আবহাওয়া বিশ্লেষণের মাধ্যমে কৃষকরা ফসল উৎপাদন বাড়াতে পারবেন। মাটির আর্দ্রতা, পুষ্টি উপাদান এবং রোগবালাই সম্পর্কে তাৎক্ষণিক তথ্য পাওয়া যাবে, যা কৃষিকে আরও আধুনিক ও লাভজনক করে তুলবে। একইভাবে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতেও ৬জি প্রযুক্তির ব্যবহার উৎপাদন বৃদ্ধি করতে পারে। শিল্পখাতে ৬জি প্রযুক্তির প্রভাব আরও ব্যাপক হবে।
স্মার্ট ফ্যাক্টরি, রোবোটিক উৎপাদন ব্যবস্থা, স্বয়ংক্রিয় সরবরাহ চেইন এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার মাধ্যমে শিল্প উৎপাদন দ্রুত ও দক্ষ হবে। তৈরি পোশাক শিল্প, যা বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি, সেখানে স্মার্ট ম্যানুফ্যাকচারিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে উৎপাদন খরচ কমানো এবং মান উন্নয়ন করা সম্ভব হবে। একইভাবে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পখাতেও ডিজিটাল অটোমেশন ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হবে। স্মার্ট সিটি গঠনের ক্ষেত্রে ৬জি প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ঢাকা ও অন্যান্য বড় শহরে যানজট, দূষণ এবং নিরাপত্তা সমস্যা সমাধানে স্মার্ট ট্রাফিক সিস্টেম, পরিবেশ পর্যবেক্ষণ এবং স্বয়ংক্রিয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা কার্যকর হতে পারে। যানবাহন, ট্রাফিক সিগন্যাল এবং সড়ক অবকাঠামোর মধ্যে সরাসরি যোগাযোগের মাধ্যমে যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে। এছাড়া বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনায় স্মার্ট গ্রিড প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিদ্যুৎ অপচয় কমানো এবং সরবরাহ নিশ্চিত করা যাবে।
ডিজিটাল অর্থনীতির ক্ষেত্রেও ৬জি প্রযুক্তি নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি করবে। মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস, ই-কমার্স, ডিজিটাল ব্যাংকিং এবং অনলাইন লেনদেন আরও দ্রুত ও নিরাপদ হবে। গ্রামীণ অর্থনীতিতেও ডিজিটাল লেনদেন বৃদ্ধি পাবে, ফলে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়বে। সরকারি সেবায় ই-গভর্ন্যান্স কার্যক্রম আরও বিস্তৃত হবে এবং নাগরিকরা দ্রুত ও স্বচ্ছ সেবা পাবে। ভূমি ব্যবস্থাপনা, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও প্রশাসনিক কার্যক্রম ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে আরও দক্ষভাবে পরিচালিত হবে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় ৬জি প্রযুক্তির ব্যবহার বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। ঘূর্ণিঝড়, বন্যা ও নদীভাঙনের মতো দুর্যোগে রিয়েল-টাইম ডেটা বিশ্লেষণ এবং দ্রুত যোগাযোগের মাধ্যমে আগাম সতর্কতা প্রদান করা সম্ভব হবে।
ড্রোন ও স্যাটেলাইট প্রযুক্তির সমন্বয়ে ক্ষয়ক্ষতির তথ্য দ্রুত সংগ্রহ করা যাবে এবং উদ্ধার কার্যক্রম আরও কার্যকরভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হবে। তবে ৬জি প্রযুক্তি বাস্তবায়নে বাংলাদেশের সামনে কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। প্রথমত, উন্নত অবকাঠামো নির্মাণের জন্য বড় বিনিয়োগ প্রয়োজন হবে। উচ্চ ফ্রিকোয়েন্সির সিগন্যাল ব্যবহারের কারণে বেশি সংখ্যক টাওয়ার স্থাপন করতে হবে। দ্বিতীয়ত, দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করা প্রয়োজন, যারা এই প্রযুক্তি পরিচালনা ও উন্নয়ন করতে পারবে। তৃতীয়ত, সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ হবে, কারণ উচ্চগতির নেটওয়ার্কে তথ্য সুরক্ষা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। এছাড়া নীতিমালা আধুনিকায়ন এবং গবেষণা ও উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়ানো প্রয়োজন হবে।
প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বাংলাদেশ যদি এখন থেকেই পরিকল্পনা গ্রহণ করে, তবে ৬জি যুগে প্রবেশের সময় দেশটি পিছিয়ে থাকবে না। ডিজিটাল বাংলাদেশ কর্মসূচির মাধ্যমে দেশে ইন্টারনেট ব্যবহার বৃদ্ধি পেয়েছে এবং বিভিন্ন খাতে ডিজিটাল সেবা চালু হয়েছে, যা ভবিষ্যতের ৬জি প্রযুক্তি গ্রহণের ভিত্তি তৈরি করেছে। বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ৬জি সম্পর্কিত গবেষণা শুরু করলে দেশীয় প্রযুক্তি উন্নয়ন সম্ভব হবে। একই সঙ্গে বেসরকারি খাত ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানো যেতে পারে। সামগ্রিকভাবে বলা যায়, ৬জি প্রযুক্তি বাংলাদেশের জন্য শুধু যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন নয়, এটি একটি নতুন অর্থনৈতিক ও সামাজিক রূপান্তরের সুযোগ এনে দেবে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, শিল্প, প্রশাসন ও নগর ব্যবস্থাপনা সব ক্ষেত্রেই এর প্রভাব পড়বে। যদিও এই প্রযুক্তি বাস্তবায়নে সময় ও বিনিয়োগ প্রয়োজন, তবুও সঠিক পরিকল্পনা ও প্রস্তুতির মাধ্যমে বাংলাদেশ ভবিষ্যতের এই প্রযুক্তিগত বিপ্লবের সুফল অর্জন করতে পারবে এবং একটি স্মার্ট, সংযুক্ত ও প্রযুক্তিনির্ভর রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার পথে আরও একধাপ এগিয়ে যাবে।
শিক্ষার্থী, ডিপার্টমেন্ট অফ আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স এন্ড মেশিন লার্নিং
চন্ডীগড় বিশ্ববিদ্যালয়, পাঞ্জাব, ভারত


















