বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
প্রকাশ: ৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৫, ১০:৩১
বিশ্বজুড়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দৌড়ে নতুন এক আলোড়ন তুলেছে চীনা এআই প্রতিষ্ঠান ডিপসিক (DeepSeek)। দাবি করা হচ্ছে, প্রায় ৯৫ শতাংশ কম খরচে তারা ওপেনএআইয়ের জিপিটি-৪ও-এর সমতুল্য সক্ষমতা দেখাতে পেরেছে। ২০ জানুয়ারি নতুন আর১ (R1) মডেল উন্মোচনের পর থেকেই প্রযুক্তি দুনিয়ায় শুরু হয়েছে তুমুল আলোচনা—এটি কি সত্যিই এআই বাজারের ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে দিতে পারবে?
ডিপসিকের উত্থান
চীনের জেজ্যাং বিশ্ববিদ্যালয়ের ইঞ্জিনিয়ারদের হাত ধরে গড়ে ওঠা ডিপসিকের যাত্রা শুরু মাত্র দুই বছর আগে। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী লিয়াং ওয়েনফেং শুরু থেকেই বলে আসছেন, তাদের লক্ষ্য শুধু আর্টিফিশিয়াল জেনারেল ইন্টেলিজেন্স (AGI) তৈরি নয়; বরং এআই তৈরির অ্যালগরিদম ও প্রোগ্রামিংকে এমনভাবে উন্নত করা, যাতে ব্যয়বহুল হার্ডওয়্যার ও বিপুল বিদ্যুৎ খরচের ওপর নির্ভরতা কমে।
ডিপসিকের দাবি, তারা ইতোমধ্যে লাভজনক—যেখানে ওপেনএআই এখনো সেই পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি।
আর১ মডেল কতটা শক্তিশালী?
গত ডিসেম্বরেই ডিপসিকের ভি৩ মডেল প্রোগ্রামিং, ডেটা বিশ্লেষণ, লেখালেখি ও জটিল গণিতে পশ্চিমা এআইগুলোর সমকক্ষতা প্রমাণ করে। এরপর ২০ জানুয়ারি প্রকাশিত আর১ মডেল ব্যবহারকারীদের রীতিমতো চমকে দিয়েছে। অনেকেই মন্তব্য করেছেন—চ্যাটজিপিটির অবশেষে সত্যিকারের প্রতিদ্বন্দ্বী এসে গেছে।
আর১ মডেল চালাতে ব্যবহৃত হয়েছে এনভিডিয়ার H800 এআই অ্যাকসেলারেটর, যা ওপেনএআইয়ের ব্যবহৃত H100 চিপের তুলনায় তুলনামূলকভাবে দুর্বল। তবু ডিপসিকের দাবি, পুরো মডেলের ট্রেনিংয়ের শেষ ধাপে খরচ হয়েছে মাত্র ৫৬ লাখ ডলার, যেখানে ওপেনএআইয়ের মডেল তৈরিতে ব্যয় হয়েছে ১০০ কোটি ডলারের বেশি।
খরচে বিশাল পার্থক্য
এআই ব্যবহারের খরচ নির্ধারিত হয় টোকেনের মাধ্যমে।
-
ওপেনএআই: প্রতি ১০ লাখ টোকেন = ১৫ ডলার
-
ডিপসিক: প্রতি ১০ লাখ টোকেন = ২ ডলার ১৯ সেন্ট
এই বিশাল পার্থক্যের কারণে বাণিজ্যিকভাবে এআই ব্যবহারকারী প্রতিষ্ঠানগুলো দ্রুত ডিপসিকের দিকে ঝুঁকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। নিখুঁততায় সামান্য ঘাটতি থাকলেও, দামে ৯৫ শতাংশ ব্যবধান কোনোভাবেই উপেক্ষা করার মতো নয়।
শেয়ারবাজারে ভূমিকম্প
ডিপসিকের কম খরচের তথ্য প্রকাশের পরপরই এর প্রভাব পড়ে বৈশ্বিক শেয়ারবাজারে। বিনিয়োগকারীরা আশঙ্কা করেন, পশ্চিমা এআই নির্মাতাদের আয় কমে যাবে। ফলে শুরু হয় ব্যাপক শেয়ার বিক্রি।
এর প্রভাবে:
-
এনভিডিয়ার শেয়ার একদিনে ৬০ হাজার কোটি ডলার বাজারমূল্য হারায়, যা যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে নজিরবিহীন।
-
গুগল, মাইক্রোসফট, অ্যামাজন ও ওপেনএআই সংশ্লিষ্ট শেয়ারেও বড় দরপতন হয়।
-
মোট মিলিয়ে প্রায় এক লাখ কোটি ডলার বাজারমূল্য কমে যায় প্রযুক্তি খাতে।
ওপেনসোর্স কৌশল
ডিপসিক তাদের এআই মডেল পুরোপুরি ওপেনসোর্স করে দিয়েছে। পশ্চিমা বিশ্বের অবিশ্বাস দূর করতেই এই উদ্যোগ বলে জানায় প্রতিষ্ঠানটি। যে কেউ চাইলে কোড পরীক্ষা করতে পারে, এমনকি নিজস্ব কম্পিউটারেও মডেল চালাতে পারে—ক্লাউডের ওপর নির্ভরতা নেই।
এর ফলে গুগল, মেটা ও ওপেনএআইয়ের একচেটিয়া আধিপত্য ভাঙতে পারে বলে মনে করছেন অনেক বিশ্লেষক।
বিতর্ক ও সন্দেহ
তবে ডিপসিকের দাবি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেক এআই বিশেষজ্ঞ।
স্কেল এআইয়ের সিইও আলেক্সান্ডার ওয়াং অভিযোগ করেছেন, শুধু H800 চিপ ব্যবহার করে এমন শক্তিশালী এআই তৈরি করা সম্ভব নয়। তাঁর দাবি, ডিপসিক অবৈধভাবে ৫০ হাজার H100 চিপ আমদানি করেছে।
এ ছাড়া আর১ মডেলের বড় অংশ ওপেনএআইয়ের জিপিটি ও১ থেকে নকল করা হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। ওপেনএআইয়ের সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট কিট (SDK) ব্যবহার করাকে কেউ কেউ “ট্রোজান হর্স” বলে অভিহিত করছেন, কারণ এতে ওপেনএআই ব্যবহারকারীরা মাত্র এক লাইন কোড বদলেই ডিপসিক ব্যবহার করতে পারে।
নিরাপত্তা ও নিষেধাজ্ঞা
ডিপসিক বর্তমানে অ্যাপল ও গুগল অ্যাপস্টোরের শীর্ষ জনপ্রিয় অ্যাপ। তবে বিপুল ব্যবহারকারীর চাপ সামলাতে গিয়ে সার্ভার সমস্যায় পড়েছে প্রতিষ্ঠানটি। তাদের দাবি, সাইবার হামলাও হচ্ছে।
এদিকে ব্যবহারকারীদের তথ্য একটি অরক্ষিত ডেটাবেইসে রাখার অভিযোগ তুলেছে সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান উইজ। যদিও ডিপসিক দ্রুত সমস্যা সমাধানের কথা জানিয়েছে, তবু তথ্য সুরক্ষা নিয়ে উদ্বেগ কাটেনি।
এই প্রেক্ষাপটে ইতালি ইতোমধ্যে ডিপসিকের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রেও নিষেধাজ্ঞা আসতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
উপসংহার
ডিপসিক কতটা সফল হবে, তা সময়ই বলবে। তবে একটি বিষয় নিশ্চিত—ডিপসিকের আবির্ভাবের মধ্য দিয়ে পূর্ব-পশ্চিম এআই যুদ্ধের সূচনা হয়ে গেছে। প্রযুক্তির ক্ষমতার মানচিত্র এখন আর আগের মতো নেই।
















