আ ন ম এহসানুল হক মিলন—বাংলাদেশের শিক্ষা খাতের ইতিহাসে একটি অবিস্মরণীয় এবং একইসাথে আলোচিত নাম। ২০০১ থেকে ২০০৬ সালের মধ্যবর্তী সময়ে তিনি যখন শিক্ষা প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন, তখন তাকে নিয়ে দেশজুড়ে তৈরি হয়েছিল এক অভূতপূর্ব মিশ্র প্রতিক্রিয়া। বর্তমানে তিনি সংসদ সদস্য না থাকলেও, দেশের ভঙ্গুর শিক্ষা ব্যবস্থা আর প্রশ্নফাঁসের ভিড়ে সাধারণ মানুষের স্মৃতিতে বারবার ফিরে আসছে তার সেই ‘নকল বিরোধী’ আপোষহীন সংগ্রামের দিনগুলো।
অতীতের সেই ‘আয়রন ফিস্ট’ বা কঠোর শাসন
দুই দশক আগের কথা। পাবলিক পরীক্ষা মানেই ছিল কেন্দ্রের বাইরে নকল সরবরাহের মহোৎসব আর হলের ভেতরে চিরকুটের ছড়াছড়ি। ঠিক সেই সময়ে এহসানুল হক মিলন একাই যেন বদলে দিয়েছিলেন পুরো চিত্রপট। সাদা সাফারি পরা এই মানুষটি কোনো প্রটোকল বা আগাম ঘোষণা ছাড়াই হুটহাট ঢুকে পড়তেন দেশের যেকোনো প্রান্তের পরীক্ষা কেন্দ্রে।
তার তল্লাশি থেকে বাদ যেত না পরীক্ষার্থীর পকেট কিংবা মোজাও। সেই সময়কার একটি আলোচিত চিত্র ছিল—মন্ত্রী আসছেন শুনে নকল সরবরাহে ব্যস্ত থাকা বহিরাগতদের দেওয়াল টপকে পলায়ন। কেবল শিক্ষার্থী নয়, নকলের মদদদাতা শিক্ষকদেরও তিনি তাৎক্ষণিক বহিষ্কার বা বিভাগীয় ব্যবস্থার আওতায় আনতেন। পাসের হার সাময়িকভাবে কমলেও, শিক্ষার যে একটি ন্যূনতম মান ও মর্যাদা থাকে, তা তিনি কঠোরভাবে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
বিতর্ক ও সমালোচনা
তবে মিলনের সেই অভিযান কেবল প্রশংসাই কুড়ায়নি, জন্ম দিয়েছিল তীব্র সমালোচনারও। অনেক শিক্ষাবিদ তখন অভিযোগ করেছিলেন, পরীক্ষার হলে এমন পুলিশি তল্লাশি শিক্ষার্থীদের মনস্তাত্ত্বিক চাপের মুখে ফেলে। আবার রাজনৈতিক মহলে আলোচনা ছিল, তিনি প্রচার পেতে বেশি পছন্দ করেন। কিন্তু সাধারণ অভিভাবক, যারা সন্তানদের সততার সাথে পড়াশোনা করাতেন, তাদের কাছে মিলন ছিলেন একজন ‘হিরো’।
বর্তমান প্রেক্ষাপট: সময় বদলেছে, চ্যালেঞ্জও কি পাল্টেছে?
দীর্ঘ সময় ক্ষমতার বাইরে থাকা মিলন এখন আর সংসদ সদস্য নন। তবে বর্তমান সময়ে যখন ডিজিটাল ডিভাইসের মাধ্যমে প্রশ্নফাঁস কিংবা বিতর্কিত কারিকুলাম নিয়ে অসন্তোষ দেখা দেয়, তখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আবারও ওঠে ‘মিলন ম্যাজিক’ এর দাবি।
এখন প্রশ্ন হলো, আগামীতে নির্বাচিত হয়ে সংসদ বা প্রশাসনে ফিরলে তিনি কি পারবেন সেই পুরনো দাপট দেখাতে?
এহসানুল হক মিলনকে নিয়ে রাজনৈতিক মতভেদ থাকতে পারে, কিন্তু তার ‘নকলমুক্ত পরীক্ষা’র লক্ষ্য নিয়ে কারও দ্বিমত নেই। আজকের দিনে মানুষ কেবল একজন এমপি বা মন্ত্রী খোঁজে না, বরং এমন একজন সাহসী প্রশাসক খোঁজে যে নির্ভয়ে বলতে পারবে—”আমার নজরদারিতে কোনো প্রশ্নফাঁস হবে না।”
আগামীতে নির্বাচিত হয়ে তিনি কি আবারও শিক্ষাঙ্গনে সেই কাঁপন ধরাতে পারবেন? নাকি পাল্টে যাওয়া সময়ের জটিলতায় ফিকে হয়ে যাবে তার পুরনো সেই তেজ? বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার এই ক্রান্তিলগ্নে মিলন কি আবারও শিক্ষার হাল ধরতে পারবেন—এই উত্তর জানতে দেশের মানুষ তাকিয়ে আছে আগামীর রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের দিকে।
















