সংসদ নির্বাচনের আগে রাষ্ট্রের মৌলিক সংস্কার প্রয়োজন—এমন মত দিচ্ছেন দেশের অর্ধেকের বেশি মানুষ। তবে গত দেড় বছরে অন্তর্বর্তী সরকার যে সংস্কার উদ্যোগ নিয়েছে, তা মূলত আমলাতন্ত্র ও তথাকথিত ‘ডিপ স্টেট’-এর প্রতিরোধে বাধাগ্রস্ত হয়েছে বলে জানিয়েছে ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (বিআইজিডি)।
বৃহস্পতিবার প্রকাশিত ‘২০২৪-এর অভ্যুত্থান–পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনীতি, সমাজ ও অর্থনীতির রূপান্তর’ শীর্ষক মূল্যায়ন প্রতিবেদনে বলা হয়, অন্তর্বর্তী সরকার শুরুতে যে জনসমর্থন ও বৈধতা পেয়েছিল, তা পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারেনি। সংস্কারের কিছু উদ্যোগ নেওয়া হলেও প্রশাসনিক কাঠামো ও ক্ষমতাশালী অনির্বাচিত গোষ্ঠীর বাধায় সেগুলো বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়ে।
প্রতিবেদনে ‘ডিপ স্টেট’ বলতে রাষ্ট্রের ভেতরে থাকা এমন এক সংগঠিত শক্তিকে বোঝানো হয়েছে, যারা নির্বাচিত কাঠামোর বাইরে থেকে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তার করে এবং নিজেদের স্বার্থ সংরক্ষণে সক্রিয় থাকে। জরিপের তথ্য অনুযায়ী, ৫১ শতাংশ মানুষ মনে করেন—নির্বাচনের আগেই প্রয়োজনীয় সংস্কার সম্পন্ন করা উচিত।
রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক গতিপথ নিয়ে জনমতেও পরিবর্তনের চিত্র উঠে এসেছে প্রতিবেদনে। ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর যেখানে ৭১ শতাংশ মানুষ দেশকে রাজনৈতিকভাবে সঠিক পথে আছে বলে মনে করতেন, ২০২৫ সালের জুলাইয়ে তা নেমে আসে ৪২ শতাংশে। একইভাবে, অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে ইতিবাচক ধারণা ২০২৪ সালের আগস্টে ছিল ৬০ শতাংশের, যা এক বছরের মধ্যে কমে দাঁড়ায় ৪৫ শতাংশে।
বিআইজিডি অন্তর্বর্তী সরকারকে ‘দুর্বল শক্তির ভারসাম্য’ অবস্থানে রয়েছে বলে মন্তব্য করেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, সরকার বিএনপির রাজনৈতিক চাপ সামাল দিতে পারলেও আমলাতন্ত্রের কঠোর প্রতিরোধের মুখে সংস্কারের প্রশ্নে বারবার পিছু হটেছে। এমনকি প্রধান উপদেষ্টা বিভিন্ন সময়ে নিজের অবস্থান পরিবর্তন করেছেন বলেও উল্লেখ করা হয়। এতে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে, নির্বাচন–পরবর্তী সময়ে আমলাতন্ত্র আরও সক্রিয় হয়ে সংস্কার প্রক্রিয়া থামিয়ে দিতে পারে, যা গণতান্ত্রিক রূপান্তরের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াবে।
রাজনৈতিক শক্তির আদর্শিক অবস্থান নিয়েও বিশ্লেষণ দিয়েছে প্রতিবেদনটি। ১৯৯১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সময়ে আওয়ামী লীগ কেন্দ্র-বাম অবস্থান থেকে ধীরে ধীরে কেন্দ্র-ডান ধারায় সরে গেছে। বিএনপি পুরো সময়জুড়ে কেন্দ্র-ডান অবস্থানে রয়েছে। নতুন দল এনসিপিকে মধ্যপন্থী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। জুলাই অভ্যুত্থানে শহুরে নিম্নবিত্ত শ্রমজীবী, শিল্পশ্রমিক ও শিক্ষার্থীদের সম্মিলিত ভূমিকা নির্ণায়ক ছিল বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
অভ্যুত্থান–পরবর্তী সময়ে সামাজিক নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগের চিত্র উঠে এসেছে। নারীরা আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রাখলেও রাষ্ট্রগঠনের প্রক্রিয়ায় তারা ক্রমেই কোণঠাসা হচ্ছেন বলে মত দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে গণপিটুনি ও সংঘবদ্ধ সহিংসতা বেড়ে যাওয়ার কথাও উল্লেখ করা হয়। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত গণপিটুনিতে নিহত হয়েছেন ২৯৫ জন। জরিপে অংশ নেওয়া ৮০ শতাংশ মানুষ এই সহিংসতা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন এবং ৬২ শতাংশ নারী নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন।
বিআইজিডির উপদেষ্টা মির্জা হাসান বলেন, প্রধান উপদেষ্টার পেছনে ছাত্রসমাজ ও জনসমর্থন থাকলেও তিনি সেই শক্তিকে সংস্কারের পক্ষে দৃঢ়ভাবে ব্যবহার করতে পারেননি। তাঁর ভাষায়, “যেদিক থেকে চাপ এসেছে, শেষ পর্যন্ত সেদিকেই তিনি ঝুঁকেছেন। ঘোষণা ছিল সংস্কারের, কিন্তু বাস্তবে হয়েছে সমঝোতা।”
সব মিলিয়ে প্রতিবেদনটি ইঙ্গিত দিচ্ছে—সংস্কারের প্রশ্নে রাজনৈতিক সদিচ্ছার পাশাপাশি আমলাতান্ত্রিক কাঠামোর ভেতরের প্রতিরোধ ভাঙাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
















