গত বছরের শেষ দিকে রাশিয়া ও ইরানের মধ্যে একটি “সামগ্রিক কৌশলগত অংশীদারত্ব চুক্তি” স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তির মাধ্যমে দুই দেশ একে অপরের অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক বিষয়ে তৃতীয় পক্ষের হস্তক্ষেপের বিরোধিতা করার অঙ্গীকার করে। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক অর্জন ছিল ইরানের জন্য, বিশেষ করে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও একটি বড় শক্তির সঙ্গে আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক গভীর করতে পেরে। কিন্তু যখন ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির শেষে ইরানের ভূখণ্ডে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক অভিযানে দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনি নিহত হন, তখন রাশিয়ার ভূমিকা অনেকটাই দর্শকের মতো ছিল। প্রেসিডেন্ট পুতিন বিবৃতিতে এই হামলাকে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন বলে অভিহিত করেছেন, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় উত্তেজনা কমানোর আহ্বান জানিয়েছে—কিন্তু তেহরান যেখানে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বা আধুনিক যুদ্ধবিমানের, সেখানে মস্কো থেকে সেগুলোর সরবরাহ বাড়ানোর কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ আসেনি। এই পরিস্থিতি একটি পুরনো প্রশ্নকে নতুন করে উস্কে দিয়েছে: সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মস্কো ও তেহরানের সম্পর্ক অভূতপূর্ব উচ্চতায় পৌঁছালেও, কেন চরম সংকটের মুহূর্তে রাশিয়া ইরানের পাশে দাঁড়াতে রাজি নয়? উত্তরের সন্ধানে গেলে দেখা যায়, এটি মস্কোর একটি সুপরিচিত কৌশলের প্রতিফলন—মিত্রতা যতই গভীর হোক না কেন, রাশিয়া নিজের কৌশলগত স্বার্থকে সর্বাগ্রে রাখে এবং সরাসরি সামরিক জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি এড়িয়ে চলে।
বিবৃতির ব্যবধান ও বাস্তবতার হিসাব
ইরানে হামলার পর রাশিয়ার প্রতিক্রিয়ার ধরনটি অনেক বিশ্লেষকের কাছে পরিচিত মনে হয়েছে। প্রথমে আসে কঠোর ভাষার নিন্দা, তারপর যুদ্ধবিরতির আহ্বান, কিন্তু তার সঙ্গে কার্যকর কোনো সামরিক বা লজিস্টিক সহায়তার প্রতিশ্রুতি ছিল না। ফরেইন অ্যাফেয়ার্সের সাম্প্রতিক একটি বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে, রাশিয়া ও ইরানের মধ্যে স্বাক্ষরিত কৌশলগত অংশীদারত্ব চুক্তিতে পারস্পরিক প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত কোনো ধারা নেই। ফলে আনুষ্ঠানিকভাবে রাশিয়া তাদের অঙ্গীকার ভঙ্গ করেনি বলেই দাবি করতে পারে। কিন্তু বাস্তবে ইরানের প্রয়োজন ছিল উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার, যেমন এস-৪০০, বা আধুনিক যুদ্ধবিমান, যেমন সু-৩৫। এই ধরনের অস্ত্র রাশিয়ার কাছে আছে, কিন্তু সেগুলো ইউক্রেন যুদ্ধের জন্য মস্কোর নিজের প্রয়োজনীয়তায় আবদ্ধ। ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রে রাশিয়া প্রতিনিয়ত দূরপাল্লার ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করছে এবং নিজস্ব আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে সুরক্ষিত রাখতে হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে ইরানকে এসব অস্ত্র সরবরাহ করা মানে নিজের যুদ্ধের রসদ কমিয়ে ফেলা—যা মস্কো করতে রাজি নয়।
রাশিয়ার এই সীমিত ভূমিকা একটি পরিচিত ধারার অংশ। ২০২৩ সালের শেষ দিকে আর্মেনিয়া ও আজারবাইজানের মধ্যে নাগোরনো-কারাবাখ সংঘাতে রাশিয়া কার্যকরভাবে হস্তক্ষেপ করেনি। আর্মেনিয়া ছিল রাশিয়ার সামরিক জোটের সদস্য, কিন্তু আজারবাইজানের কাছে পুরো অঞ্চলটি হাতছাড়া হয়ে গেলেও মস্কো নীরব ছিল। এর এক বছর পর সিরিয়ার রাজধানী দামেস্কে বিদ্রোহীরা বাশার আল-আসাদের সরকারকে উৎখাত করলেও রাশিয়া সেখানে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি। এমনকি ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে অপহরণের পরও রাশিয়ার প্রতিক্রিয়া ছিল মূলত কূটনৈতিক ভাষায় সীমাবদ্ধ। এই ঘটনাগুলো রাশিয়ার বৈশ্বিক প্রভাবের একটি সীমাবদ্ধতা তুলে ধরে: ইউক্রেনের যুদ্ধে মস্কোর সম্পদ ও মনোযোগ এতটাই নিবদ্ধ যে অন্য কোনো সংকটে বড় ধরনের সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার সামর্থ্য তাদের নেই। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, রাশিয়া কখনোই নিজেকে এমন কোনো দ্বন্দ্বে সরাসরি জড়ায়নি যা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রত্যক্ষ সংঘর্ষের ঝুঁকি তৈরি করে। ইরানের ক্ষেত্রেও তা প্রযোজ্য।
সম্পর্কের বন্ধন যেভাবে গভীর হয়েছিল
রাশিয়া ও ইরানের বর্তমান সম্পর্কের ভিত্তি কিন্তু খুব পুরনো নয়। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর দুই দেশ ধীরে ধীরে একে অপরের দিকে এগোতে শুরু করে। ১৯৯০-এর দশকে রাশিয়া ইরানকে মিগ-২৯ যুদ্ধবিমান, কিলো শ্রেণির সাবমেরিন এবং টি-৭২ ট্যাংকের মতো সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ করে। কিন্তু সেই সহযোগিতা ছিল সীমিত এবং ব্যবসায়িক চরিত্রের। প্রকৃত অর্থে সম্পর্ক গভীর হয় ২০১৫ সালে সিরিয়ার গৃহযুদ্ধে। বাশার আল-আসাদের সরকারকে টিকিয়ে রাখতে রাশিয়া আকাশ থেকে সহায়তা দেয়, আর ইরান স্থলবাহিনীকে শক্তিশালী করে। এই অভিজ্ঞতা দুই দেশের মধ্যে কৌশলগত সমন্বয়ের একটি দৃষ্টান্ত তৈরি করে। তবে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আসে ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসনের পর।
ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর ইরান রাশিয়ার জন্য এক অনন্য অংশীদারে পরিণত হয়। প্রথমত, ইরান রাশিয়াকে ‘শাহেদ’ সিরিজের ড্রোন সরবরাহ করে, যা পরে রাশিয়া নিজস্ব কারখানায় উৎপাদন শুরু করে। দ্বিতীয়ত, ইরান নিষেধাজ্ঞা মোকাবিলায় অভিজ্ঞ একটি দেশ। গত এক দশকে তারা “শ্যাডো ফ্লিট” নামে পরিচিত একটি ট্যাংকার নেটওয়ার্ক তৈরি করে, যা নিষিদ্ধ তেল পরিবহন করত। ইউক্রেন যুদ্ধের পর রাশিয়া এই অভিজ্ঞতা ও অবকাঠামো ব্যবহার করে নিজের তেল রপ্তানি অব্যাহত রাখতে সক্ষম হয়। তৃতীয়ত, ইরানকে আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে অন্তর্ভুক্ত করার ক্ষেত্রেও রাশিয়া সক্রিয় ভূমিকা রাখে। ২০২৩ সালে সাংহাই সহযোগিতা সংস্থা এবং পরের বছর ব্রিকস জোটে ইরানের সদস্যপদ অর্জনে মস্কোর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। বাণিজ্যও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে—যেখানে আগে বার্ষিক বাণিজ্য প্রায় দুই বিলিয়ন ডলারের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল, এখন তা পাঁচ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। দুই দেশের সম্পর্কের এই গভীরতা থেকে মনে হতে পারে, ইরান সংকটে রাশিয়া স্বাভাবিকভাবেই আরও সক্রিয় ভূমিকা নেবে।
সংকটে নীরবতা: তিনটি কৌশলগত কারণ
কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। রাশিয়ার নীরবতার পেছনে তিনটি প্রধান কৌশলগত কারণ কাজ করছে। প্রথমত, ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার নিজস্ব সম্পদের সীমাবদ্ধতা। ইরানের সবচেয়ে জরুরি প্রয়োজন ছিল উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং আধুনিক যুদ্ধবিমান। কিন্তু এস-৪০০ ও সু-৩৫-এর মতো সরঞ্জাম রাশিয়ার নিজেদের যুদ্ধের জন্য অপরিহার্য। এগুলো ইরানকে সরবরাহ করা মানে নিজের প্রতিরক্ষা দুর্বল করে ফেলা। দ্বিতীয়ত, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি সংঘর্ষের ঝুঁকি এড়ানো। রাশিয়া বর্তমানে ইউক্রেন ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কূটনৈতিক আলোচনা করছে এবং আশা করছে নিষেধাজ্ঞার কিছুটা শিথিলতা অর্জন করতে পারবে। ইরানের পক্ষে সরাসরি সামরিক পদক্ষেপ নিলে এই আলোচনা ব্যাহত হবে। তৃতীয়ত, মধ্যপ্রাচ্যে ভারসাম্য রক্ষার প্রয়োজনীয়তা। রাশিয়ার সম্পর্ক কেবল ইরানের সঙ্গেই নয়, ইরানের প্রতিদ্বন্দ্বী উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গেও গুরুত্বপূর্ণ। সংযুক্ত আরব আমিরাত রাশিয়ার জন্য একটি আর্থিক ও লজিস্টিক কেন্দ্র। সৌদি আরব ওপেক প্লাস জোটে রাশিয়ার প্রধান অংশীদার। ইরানের পক্ষে অতিরিক্ত ঝুঁকে পড়লে এই সম্পর্কগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। মস্কো তাই এই জটিল সমীকরণে একটি ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান নিতে চায়।
এই তিনটি কারণের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরও একটি বাস্তবতা: ইরান সংকট রাশিয়ার জন্য কিছু পরোক্ষ সুবিধাও তৈরি করছে। হরমুজ প্রণালি নিয়ে উত্তেজনা বাড়ায় বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তেলের দাম বেড়েছে। এতে রাশিয়ার তেল বিক্রির আয় বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রও বাজার স্থিতিশীল রাখতে কিছু নিষেধাজ্ঞা সাময়িকভাবে শিথিল করেছে, যা রাশিয়ার জন্য সহায়ক। একইসঙ্গে উপসাগরীয় অঞ্চলের তরল প্রাকৃতিক গ্যাস রপ্তানি কমে গেলে এশিয়ার বাজারে রাশিয়ার গ্যাসের চাহিদা বাড়তে পারে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রকে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও নির্ভুল অস্ত্র ব্যবহার করতে হচ্ছে, যা ইউক্রেনের জন্য বরাদ্দ কমিয়ে দিতে পারে। এই পরোক্ষ সুবিধাগুলো পাওয়ার জন্যই মস্কো সরাসরি জড়িয়ে না পড়ে সংকটের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থেকে লাভ তোলার কৌশল নিয়েছে।
গোপন সহায়তার সীমাবদ্ধতা
যদিও প্রকাশ্যে রাশিয়া সামরিক সহায়তা দিচ্ছে না, ধারণা করা হয় কিছু গোপন সহায়তা অব্যাহত থাকতে পারে। যেমন মহাকাশভিত্তিক গোয়েন্দা তথ্য, নজরদারি বা হামলার লক্ষ্য নির্ধারণে সহায়তা। কিন্তু এই সহায়তার প্রভাব অনেক সীমিত। ইরানের প্রধান সমস্যা হলো উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার অভাব—যা রাশিয়ার কাছ থেকে না এলে অন্য কোথাও পাওয়ার সম্ভাবনা কম। গোপন সহায়তার মাধ্যমে এই সমস্যার সমাধান হয় না। আরেকটি বিষয় হলো, রাশিয়া হয়তো আশা করছে সংকট দীর্ঘায়িত হলে ইরান আরও বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়বে এবং ভবিষ্যতে রাশিয়ার সঙ্গে আরও গভীর সামরিক সহযোগিতায় রাজি হবে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে বর্তমানে সীমিত ভূমিকা রাখা একটি দীর্ঘমেয়াদি কৌশলের অংশ হতে পারে।
ভবিষ্যৎ ও উপসংহার
ইরানের জন্য বর্তমান সংকট একটি কঠিন বাস্তবতা তুলে ধরেছে: কৌশলগত অংশীদারত্ব চুক্তি যতই গুরুত্বপূর্ণ হোক না কেন, চরম সংকটের সময় প্রতিটি দেশ নিজের স্বার্থকে প্রাধান্য দেয়। রাশিয়া ইরানের সঙ্গে সম্পর্কের মূল্য বোঝে, কিন্তু ইউক্রেনের যুদ্ধে ব্যস্ত থাকা অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রত্যক্ষ সংঘর্ষের ঝুঁকি নিতে রাজি নয়। মস্কো বরং এই সংকট থেকে পরোক্ষভাবে লাভবান হওয়ার পথ খুঁজছে—জ্বালানি বাজারে বাড়তি আয়, ইউক্রেনে যুক্তরাষ্ট্রের মনোযোগের বিভাজন এবং ইরানকে ভবিষ্যতে আরও নির্ভরশীল করে তোলার সম্ভাবনা। রাশিয়ার এই অবস্থান ইরানের জন্য একটি শিক্ষা। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা ও বিচ্ছিন্নতার মধ্যেও ইরান নিজেকে টিকিয়ে রেখেছে, কিন্তু একটি বড় শক্তির ওপর নির্ভরতা কতটা নির্ভরযোগ্য, তা এই সংকটে আবারও যাচাই হয়ে গেল। ইরানকে এখন বুঝতে হবে, কৌশলগত চুক্তি শুধুমাত্র কাগজের বন্ধন নয়—প্রকৃত সংহতি তখনই দৃশ্যমান হয় যখন স্বার্থের মিল সবচেয়ে গভীর হয়। বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই স্বার্থের মিল রাশিয়ার কাছে ইরানের প্রত্যাশার চেয়ে অনেক সংকীর্ণ। ফলে তেহরানের ভবিষ্যৎ কৌশল নির্ধারণে এই বাস্তবতাকে বিবেচনায় রাখতে হবে।
















