লেখক: রিদুয়ানুল ইসলাম
চিন্তক ও লেখক
সিনেমার নাম জন নায়গান। মানে জন নায়ক। ভক্তরা এমনিতেও বিজয়কে থালাপাথি নামেই ডাকে। থালাপাথি মানে হলো কমান্ডার। ঐ একই কথা, জন নায়াগান বলেন বা থালাপাথি, মূলভাব হলো তিনি নেতা। এতদিন অভিনেতা ছিলেন ; এখন নেতা। ছিলেন বলতে হচ্ছে কারণ তিনি অভিনয় ছাড়ছেন। রাজনীতির মাঠে নেমে গেছেন আরো আগেই। ছেড়ে দেওয়ার আগে swan song হিসেবে জন নায়াগান নিয়ে সিলভার স্ক্রিনে আসতে যাচ্ছিলেন ৯ই জানুয়ারী। কিন্তু সেটা আটকে গেছে সেন্সর বোর্ডে। খুব বেশী বিজ্ঞ হওয়ার দরকার নেই। বিজয়ের এর আগে আরও ৬৮ টা মুভি আছে। কোন মুভিই আটকায়নি। এটা আটকে গেছে। বলা ভালো, সেন্সর বোর্ডে ঘাড়ে বন্দুক রেখে এটাকে আটকে দেওয়া হয়েছে।
ঘটনার পেছনে
গত ১ বছরে বিজয় তার রাজনৈতিক দল টিভিকে(TVK) দিয়ে তামিলনাড়ুর পলিটিক্যাল ল্যান্ডস্কেপ পাল্টে দিয়েছেন। DMK এবং AIADMK এর পাশাপাশি তার দলও ইতিমধ্যে তামিলনাড়ুর পলিটিক্যাল বিগফিশ হিসেবে দৃশ্যপটে চলে এসেছে।
জন নায়াগান মুভির অডিও লঞ্চ অনুষ্ঠান বিজয় এবার মালয়েশিয়ায় করেছেন। মালয়েশিয়া ভারতের বাইরে তামিল ভাষাভাষী লোকজনের জন্য সবচেয়ে বড় ডায়াসপোরা। প্রচুর তামিলভাষী লোকজন মালয়েশিয়ায় থাকেন। আমাদের অনেকের যেমন চোরাগুপ্তা টাকার সেকেন্ড হোম মালয়েশিয়ায়, ঐভাবে না ; ঐতিহাসিকভাবেই থামিজান লোকজন মালয়েশিয়ায় থাকেন। মালয়েশিয়ার সরকারের বিভিন্ন প্রভাবশালী মন্ত্রীরাও তামিল বংশীয়। বিজয় তার সিনেমার অডিও লঞ্চের জন্য বেছে নিয়েচিলেন মালয়েশিয়াকেই। প্রায় ৯০ হাজার দর্শক উপস্থিত ছিলেন। সিনেমার হাইপ যে কতটুকু ছিলো সেটা এখান থেকেই আন্দাজ করা যায়।
কিন্তু বিজয় যে তোপ দাগিয়ে এসেছেন তার কেন্দ্রীয় সরকারকে! তার পলিটিক্যাল পার্টির লঞ্চিং অনুষ্ঠানে মাদুরাইয়ে তিনি ঘোষণা দিয়েছিলেন পেরিয়ারিজম (দ্রাবিড় পলিটিক্সের জনক, বিখ্যাত বামপন্থী রাজনীতিবিদ) তো থাকবেই, সাথে বিজেপির রাইট উইং রাজনীতির বিরূদ্ধেও তার দলের অবস্থান থাকবে।
আর যাই কোথায়? শাসকগোষ্ঠী তক্কে তক্কে ছিলো, কেমনে বধিব পরাণ? আর তার জন্য তারা বেছে নিয়েছে বিজয়ের সবশেষ সিনেমাটিকেই।
সিনেমায় বিজয়ের পলিটিক্যাল রেফারেন্স
একটু পেছন ফিরে দেখলে অবশ্য ভিন্নচিত্র পাওয়া যাবে। বিজয় বহু আগে থেকেই সিনেমায় পলিটিক্যাল রেফারেন্স ব্যবহার করে আসছিলেন। তার সরকার সিনেমাটা যে কাহিনী ঘিরে আবর্তিত, সেই একই ঘটনা দিয়ে কংগ্রেস বর্তমানে বিজেপিকে তুলোধুনো করে ছাড়ছে। সরকার সিনেমায় বিজয়ের নিজের ভোট আরেকজন দিয়ে দেওয়ায় রেজিমই বদলে দিয়েছিলেন তিনি। রাহুল গান্ধী ২০২৫ সালের আগস্টে লোকসভায় দাঁড়িয়ে বলেন, কর্ণাটকের মহাদেবপুরায় ভারতীয় নির্বাচন কমিশন ভুয়া ভোটার তালিকাভুক্ত করেছেন। দীপংকর শংকর নামে একজন অধিবাসীর বাসার ঠিকানা ৮০ জন ভোটারের জন্য ব্যবহার করা হয়েছে, যে বাসার আয়তন ১০ ফুটের মত! হরিয়ানার ২০২৪ সালের রাজ্যসভা নির্বাচনে ২৫ লক্ষ ভোট চুরি হয়েছে বলেও রাহুল দাবী করেন গত নভেম্বরে।
যে বিষয়টা সামনে রেখে রাহুল বা কংগ্রেস জোট এখন রাজনীতি করছে, বিজয় তার সিনেমায় ৮ বছর আগেই সেসব দেখিয়ে ফেলেছিলেন। তখন বিজয়ের কিন্তু সমস্যা হয়নি।
২০১৭ সালে মেরসাল সিনেমায়ও বিজয় তৎকালীন ভারতে নতুন চালু হওয়া GST ( Goods and Services Tax) নিয়ে সমালোচনা করে সরাসরি রাজনৈতিক বক্তব্য দিয়েছিলেন। এমনকি তার সিনেমার স্ক্রিনিং তখন কিছু জায়গায় বন্ধ করে দিয়েছিলেন উগ্র ” অন্ধভক্তরা “। কিন্তু সেন্সরে আটকায়নি তার কোন সিনেমাই।
উপরের ঘটনাগুলোয় বিজয়ের সিনেমা কিছু ব্যাকল্যাশ ফেইস করেছে, কিন্তু সিনেমা আটকানোর মত ঘটনা ঘটেনি। এবার সেটাই ঘটলো। কারণ আগের বিজয় আর এখনকার বিজয় এক নন। এখন বিজয় মোদীর প্রকাশ্য রাজনৈতিক শত্রুও বটে।
আরও যা বলা দরকার
যে সময়গুলোতে বিজয়ের সিনেমা কোন যৌক্তিক কারণ ছাড়াই আটকে দেওয়া হচ্ছে, সেই সময়গুলোয় কাশ্মীর ফাইলস বা তাজ স্টোরির মত অসত্য ও হীণ উদ্দেশ্যে তৈরী সিনেমাগুলো রাষ্ট্রীয় প্রণোদনায় মুক্তি পাচ্ছে। বিজয়ের দোষ কেবল একটাই, সেটা হলো তার সিনেমা পলিটিক্যালি মোটিভেটেড। এবং এটা হওয়া খুব স্বাভাবিক। সাউথের বহু স্টার সিনেমা থেকে রাজনীতিতে এসেছিলেন। এমজিআর, এনটিআর, জয় ললিতা এরকম আরো অনেক লিজেন্ড সিনেমা থেকে পলিটিক্সে মুভ করেছিলেন। শিবাজী গণেশনও আচেন এই তালিকায়, যাকে তামিলনাড়ুতে স্টারদের স্টার বলা হয়।
এটা খুবই স্বাভাবিক। বিশ্বের সবচেয়ে বড় গণতান্ত্রিক দেশে এটা ঘটবেই। পলিটিক্সে তারকাদের আগ্রহ থাকবেই। ভারতে এই মুহুর্তে এমন কোন রাজনৈতিক দল নেই যেখানে তারকারা নেই।
সিনেমার রিলিজ স্থগিত হওয়ার পাশাপাশি বিজয়ের ওপর খড়গ হিসেবে নেমে এসেছে সিবিআই ইনকোয়ারি। তার সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পদযাত্রায় ৪০ জন পদদলিত হয়ে মারা যাওয়ার ঘটনায় সিবিআই তদন্তের নামে বিজয়কে কল করেছে। তাও তার স্থগিত হওয়া সিনেমা মুক্তির তিনদিন আগে। রাষ্ট্রযন্ত্র বিজয়কে আষ্টেপৃষ্ঠে চেপে ধরার সব আয়োজন সম্পন্ন করেছে, সেটা বুঝাই যাচ্ছে। বিজয় নিহতদের জন্য ২০ লাখ টাকার ক্ষতিপূরণও ঘোষণা করেছিলেন।
সমস্যাটা কোথায়
সমস্যাটা হলো বিজয়ের সাথে এসব ঘটছে এমন এক দেশে যে দেশ নাকি বিশ্বের সবচেয়ে বৃহৎ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র! এই তথাকথিত উদার গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে ফ্রিডম অব স্পিচের অবস্থা যে কি দাঁড়িয়েছে, তা এসব ঘটনায় সহজেই অনুমেয়। এই মুহুর্তে বিজয় সন্দেহাতীতভাবে দক্ষিণের সবচেয়ে জনপ্রিয় অভিনেতাদের একজন। তার সাথেই ঘটছে এসব। অভিনেতা থেকে নেতা হতে চাওয়ার কারণে! পবণ কল্যাণের সাথেও এসব হয়েছে, তবে তিনি নিজেই এখন শাসকগোষ্ঠী।
বিজয়ের ক্ষতি সাময়িক, তবে এই ঘটনায় মুল বিজয়টা বিজয়েরই। হয়তো সময়ের অপেক্ষা।
















