ডেস্ক রিপোর্ট : ক্যান্সার একটি ভয়াবহ ব্যাধি, ক্যান্সার এ শতাব্দীতে একটি অমীমাংসিত বিপর্যয়কর চিকিৎসার চ্যালেঞ্জ যা আগামী দশকে ২০৪০ সালের মধ্যে আরো লাখ লাখ লোককে আক্রান্ত করতে চলেছে। এই ধরনের রোগের চিকিৎসা খুবই জটিল এবং ব্যায়বহুল। কিন্তু তারপরেও সম্পূর্ণরূপে সুস্থতা হওয়া নির্ভর করে শারীরিক অবস্থার উপর।
কিন্তু গণস্বাস্থ্য হোমিও নামে একটি প্রতিষ্ঠান এই ক্যান্সারের চিকিৎসার নাম দিয়ে করছে ভয়াবহ প্রতারণা। নামধারী ভুয়া চিকিৎসক এস এম সারওয়ার তার টিম নিয়ে এই ধরনের প্রতারণা করে আসছেন বহু বছর ধরে। এমন ভয়াবহ তথ্যই উঠে এসেছে দৈনিক কালবেলার একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন থেকে।
কালবেলার রিপোর্টার শাহনেওয়াজ খান সুমনের প্রতিবেদনে উল্লেখ্য করা হয়, গণস্বাস্থ্য হোমিওর দুটি কার্যালয় আছে। একটি ঢাকার পল্টনের বায়তুল ভিউ টাওয়ারে ১১ তলায় এবং অন্যটি হবিগঞ্জের পৌর বাস টার্মিনাল এলাকায়। সপ্তাহের প্রথম তিন দিন ঢাকায় এবং শেষের তিনদিন হবিগঞ্জে চেম্বার করেন এস এম সারওয়ার। সম্প্রতি ঢাকা কার্যালয়ে সরেজমিনে কালবেলার প্রতিবেদকের কাছে দৃশ্যমান হয়, অসংখ্য মানুষ ভীড় করছেন চেম্বারে।
প্রতিবেদনে আরো উল্লেখ্য করা হয়, গণস্বাস্থ্য হোমিওর কর্মীদের দাবী, এখানে সবাই রোগী। তবে পর্যবেক্ষণ করে দেখা যায়, এখানে অধিকাংশই রোগী সেজে আসে যাতে করে বুঝা যায় ডাক্তারের কাছে অসংখ্য রোগী আসে। এখানে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যক্তি জানায়, “আমি রোগী না,এখানে এসে সিরিয়াল দিয়ে বসে থাকলে কিছু টাকা পাই,এজন্য মাঝেমধ্যে আসি”।
অন্তত ১০ জন রোগীর সাথে কথা বলে জানা যায়, তারা বিভিন্ন সময়ে ফেসবুক কিংবা ইউটিউবে বিজ্ঞাপন দেখে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এখানে এসেছেন চিকিৎসা নেয়ার জন্য। কয়েকজন ক্যান্সার রোগী জানিয়েছেন,তারা বিভিন্ন হাসপাতালে গণস্বাস্থ্যের প্রতিনিধিদের মাধ্যমে এখানে এসেছেন চিকিৎসা নিতে।
কালবেলার অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে আরেক তথ্য। জানা যায়, এস এম সারওয়ার এসএসসি পাশ করার পর হোমিওপ্যাথিতে চার বছরের ডিপ্লোমা করে বসে যান এশিয়ার সবচেয়ে সফল ক্যান্সার গবেষক হিসেবে। নামে-বেনামে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ৩০০ এর অধিক একাউন্ট খুলে বিজ্ঞাপন আকারে প্রচার করেন। এই প্রতারণার কাজে যুক্ত আছেন অন্তত ৪০ জন নামধারী ডাক্তার যাদের সার্টিফিকেট নেই। ৬০ জনেরও অধিক বিজ্ঞাপনকর্মী এবং ১০০ জনের অধিক দালাল বা এজেন্ট। এসব একাউন্টে মূলত টাকার বিনিময়ে ভুয়া রোগী দেখিয়ে ভিডিও বানানো হয়। যাদের আদৌ ক্যান্সার থেকে সুস্থ হওয়ার কোনো প্রমাণ নেই।
কালবেলার প্রতিবেদক একজন ভুক্তভোগীর সাথে কথা বলেন। ভুক্তভোগী চট্রগ্রামের বাসিন্দা সুমী আক্তার ব্লাড ক্যান্সারের চতুর্থ স্টেজের রোগী। দেশ-বিদেশের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নেয়ার পর তিনি ইউটিউব বিজ্ঞাপন দেখে রাজধানীর পল্টনের গণস্বাস্থ্য হোমিওতে আসেন চিকিৎসা নিতে। প্রথমে রোগীর কাছ থেকে ৪০ হাজার টাকা নেয়া হয়,বিনিময়ে দেয়া হয় ১৩০ টি ওষুধ। প্রতিশ্রুতি দেয়া হয় মাত্র চার মাসেই ক্যান্সার ভালো হয়ে যাবে। ২ মিনিট পর পর খেতে হবে নিয়ম করে এই ওষুধ। কিন্তু এস এম সারওয়ারের পরামর্শ অনুযায়ী এই ওষুধ সেবন করায় দুই মাসের মধ্যেই রোগী অবস্থার অবনতি হলে চিকিৎসা বন্ধ করে দেন ভুক্তভোগী।
গণস্বাস্থ্যের প্রতারণা নিয়ে ভুক্তভোগী সুমির স্বামী আক্তার হোসেন প্রতিবেদকের কাছে বলেন,”ইউটিউবে বিজ্ঞাপনের প্রলোভনে পড়ে এখানে আসি, কিন্তু পরে খোঁজ নিয়ে জানতে পারি আমরা ভয়ংকর প্রতারণার শিকার হয়েছি”।
শুধু সুমিই নন, এমন অসংখ্য ব্যক্তিকে প্রতারণার ফাঁদে ফেলে সর্বস্বান্ত করেছে ভুয়া ডাক্তার খ্যাত এস এম সারওয়ার- জানিয়েছেন কয়েকডজন ভুক্তভোগী।
এই বিষয়ে সাক্ষাৎকার নেয়া হয়েছে বাংলাদেশ হোমিওপ্যাথিক মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের প্রিন্সিপাল অধ্যাপক ডাক্তার মো.নাসির উদ্দিন শেখের। তিনি জানান, “ক্যান্সার,থ্যালাসেমিয়া বা এইডস পুরোপুরি নির্মূলের দাবি করা হোমিওর নামে সুস্পষ্ট প্রতারণা,হোমিওপ্যাথিতে কখনোই ক্যান্সার সম্পূর্ণ নিরাময় হয় না”।
জানা যায়, এখানে চিকিৎসা পদ্ধতি হোমিও নীতির বিপরীত। এখানে হোমিও,আয়ুর্বেদিক এবং হামদর্দ সহ সব ধরনের ওষুধ বিক্রি করা হয় যা হোমিও নীতিবিরুদ্ধ।
সরকারী হোমিওপ্যাথিক মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সাবেক প্রিন্সিপাল এবং মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক ডা.মো.শফিকুল আলম এই বিষয়ে বলেন,”হোমিও ডাক্তার অন্য কোনো চিকিৎসা পদ্ধতির ওষুধ বিক্তি করতে পারবেন না”।
কালবেলার সাংবাদিক এ প্রতারণার বিষয়ে জানতে চাইলে অভিযুক্ত এস এম সারওয়ারকে প্রশ্ন করলে তিনি উত্তেজিত হয়ে বলেন” আমাকে কিছু বললে হোমিও কাউন্সিল ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বলবে। আপনি প্রশ্ন করার কে?”।
এই বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা.মো. আবু জাফর বলেন, “এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে আমি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিবো”।
সূত্র : দৈনিক কালবেলা
















