বাংলাদেশে শিল্প ও বৈশ্বিক বাণিজ্যে গতি আনতে দেশের প্রথম মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল (ফ্রি ট্রেড জোন–এফটিজেড) স্থাপনের নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা)। প্রস্তাবিত এই এফটিজেড গড়ে উঠবে চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলায়।
সোমবার রাজধানীর তেজগাঁওয়ে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে বেজার গভর্নিং বোর্ডের বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। সভা শেষে বেজার নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন সাংবাদিকদের জানান, আনোয়ারায় প্রায় ৬০০ থেকে ৬৫০ একর জমিতে এই মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা রয়েছে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের বিদ্যমান অর্থনৈতিক কাঠামোতে এখনো কার্যকর কোনো ফ্রি ট্রেড জোন নেই। নতুন এ অঞ্চল কাস্টমস ব্যবস্থার বাইরে একটি ‘অফশোর টেরিটরি’ হিসেবে কাজ করবে। এখানে পণ্য সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও পুনঃরপ্তানির সুযোগ থাকবে, কোনো ধরনের শুল্ক আরোপ ছাড়াই।
এফটিজেড স্থাপনের মূল লক্ষ্য হিসেবে রপ্তানিমুখী শিল্পে কাঁচামাল সরবরাহের সময় উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনার কথা জানান বেজা চেয়ারম্যান। তাঁর ভাষায়, বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশ থেকে তুলার মতো কাঁচামাল আনতে দীর্ঘ সময় লাগে, যা দ্রুত ডেলিভারিভিত্তিক রপ্তানি অর্ডারে বড় বাধা। এফটিজেডে কাঁচামাল মজুত থাকলে স্থানীয় শিল্পকারখানা তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবহার করতে পারবে এবং প্রয়োজন হলে অন্য দেশেও পুনঃরপ্তানি সম্ভব হবে।
বৈশ্বিক উদাহরণ হিসেবে তিনি দুবাইয়ের জেবেল আলী ফ্রি জোনের কথা উল্লেখ করেন। প্রায় ১৪ হাজার একর আয়তনের এই অঞ্চল থেকে বছরে প্রায় ১৯০ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য পরিচালিত হয়, যা দুবাইয়ের অর্থনীতিতে বড় অবদান রাখছে। বাংলাদেশও অফশোর বাণিজ্যভিত্তিক কর্মকাণ্ড বিস্তারের মাধ্যমে একই ধরনের সুফল অর্জনের লক্ষ্য নিয়েছে বলে জানান তিনি।
তবে নীতিগত অনুমোদনের পর প্রস্তাবটি চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য মন্ত্রিসভায় পাঠানো হবে। এ ছাড়া ফ্রি ট্রেড জোন বাস্তবায়নে বিদ্যমান আইন ও নীতিমালায় প্রয়োজনীয় সংশোধনের বিষয়টি পরবর্তী সরকার বাস্তবায়ন করবে বলে জানান বেজা চেয়ারম্যান। চলতি বছরের মধ্যেই প্রাথমিক পর্যায়ে দৃশ্যমান অগ্রগতির আশাবাদও ব্যক্ত করেন তিনি।
একই বৈঠকে মীরসরাইয়ে একটি ডিফেন্স ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক স্থাপনের নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বেজা সূত্র জানায়, প্রায় ৮০ একর জমিতে এই পার্ক গড়ে তোলা হবে। এর আগে জমিটি একটি বিদেশি অর্থনৈতিক অঞ্চলের জন্য নির্ধারিত থাকলেও প্রকল্পটি বাতিল হওয়ায় নতুন করে প্রতিরক্ষা শিল্প পার্ক হিসেবে ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন বলেন, বৈশ্বিক প্রতিরক্ষা শিল্প দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে এবং এই খাতে বাংলাদেশের অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি দেশের সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ ব্যবস্থাকে আরও নিরাপদ ও স্বয়ংসম্পূর্ণ করাও এই প্রকল্পের লক্ষ্য। গুলি, যন্ত্রাংশ কিংবা সাঁজোয়া যান–সংক্রান্ত মৌলিক সরঞ্জাম দেশেই উৎপাদনের সক্ষমতা গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার ওপর তিনি জোর দেন।
দীর্ঘদিনের আন্তঃমন্ত্রণালয় আলোচনার ফল হিসেবেই ডিফেন্স ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কের প্রস্তাব এসেছে বলে জানান তিনি। নীতিগত অনুমোদনের পর জাতীয় অর্থনৈতিক অঞ্চল মাস্টার প্ল্যানে এটি অন্তর্ভুক্ত করার কাজ শুরু হবে।
এ ছাড়া বৈঠকে কুষ্টিয়া চিনিকলকে পূর্ণাঙ্গ শিল্প পার্কে রূপান্তরের নীতিগত সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে। বেজার তত্ত্বাবধানে চিনিকল এলাকার জমি ব্যবহার করে একটি নতুন অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথা জানান নির্বাহী চেয়ারম্যান।
ব্রিফিংয়ে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম উপস্থিত ছিলেন।
















