রান্নার লিকুইড পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) সংকট জানুয়ারিতেও অব্যাহত রয়েছে। পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি না হলে আগামী মাসের শুরুতেও সরকার ও ভোক্তাদের জন্য সংকট আরও তীব্র হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
খাত সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, চলতি জানুয়ারিতে দেশে এলপিজির চাহিদা এক লাখ ৫০ হাজার টনের বেশি হলেও এখন পর্যন্ত নিশ্চিত আমদানি হয়েছে প্রায় এক লাখ ২০ হাজার টন। বাকি চাহিদা পূরণে সরকারের পক্ষ থেকে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে একাধিক বৈঠক করা হচ্ছে, তবে এখনো নির্দিষ্ট সমাধান আসেনি।
এলপিজি অপারেটররা জানান, আন্তর্জাতিক স্পট মার্কেট থেকে গ্যাস আমদানির চেষ্টা চলছে। কিন্তু জাহাজ ভাড়া বৃদ্ধি, সরবরাহকারী সংকট এবং বৈশ্বিক বাজারের অস্থিরতার কারণে আমদানি প্রক্রিয়া জটিল হয়ে উঠেছে। সংকট মোকাবেলায় সৌদি আরব, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ফিলিপাইনের সঙ্গে আলোচনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরকারের পরিকল্পনায় এক লাখ টন এলপিজি আমদানির কথা থাকলেও তা দেশে পৌঁছাতে মার্চ পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।
এদিকে বাজারে এলপিজির সরবরাহ সংকট স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। অনেক এলাকায় নির্ধারিত ১৩০৫ টাকার পরিবর্তে ১২ কেজির সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে ২৩০০ থেকে ২৬০০ টাকায়। এতে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের রান্নার ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বাধ্য হয়ে অনেক পরিবার ইলেকট্রিক চুলা বা মাটির চুলার মতো বিকল্প ব্যবহারে ঝুঁকছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, তথ্য-উপাত্ত ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা এবং ইরানের অভ্যন্তরীণ বিক্ষোভ বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের বিঘ্ন সৃষ্টি করেছে। ফলে সংকট কতদিন চলবে—তা নির্ধারণ করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে এলপিজি আমদানি হয়েছিল ১৬ লাখ ১০ হাজার টন। ২০২৫ সালে তা কমে দাঁড়ায় ১৪ লাখ ৬৫ হাজার টনে। একই সময়ে পাইপলাইনে গ্যাস সংকট বাড়ায় শিল্প খাতে এলপিজির ব্যবহার উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে শিল্প খাতে মোট এলপিজি চাহিদার প্রায় ৩০ শতাংশ ব্যবহৃত হচ্ছে।
রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বেক্সিমকোসহ পাঁচটি বড় কোম্পানি ব্যাংকিং সীমাবদ্ধতার কারণে এলপিজি আমদানিতে যেতে পারছে না। এসব প্রতিষ্ঠানের চাহিদা পূরণে অন্য কোম্পানিগুলো সক্ষম হয়নি। পাশাপাশি ইরানে দীর্ঘদিনের বিক্ষোভের কারণে চীনসহ কয়েকটি দেশ সেখান থেকে এলপিজি আমদানি বন্ধ রেখেছে। ফলে তারা স্পট মার্কেট থেকে বেশি দামে বড় পরিমাণে এলপিজি কিনছে, যা বাংলাদেশের জন্য প্রতিযোগিতাকে আরও কঠিন করে তুলেছে।
যুক্তরাষ্ট্র ইরানের গ্যাস পরিবহনের অভিযোগে ২২টি জাহাজে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করায় আন্তর্জাতিক বাজারে জাহাজ সংকট তীব্র হয়েছে। বড় দেশগুলো এক লাখ টনের বড় চালানে এলপিজি কিনে নিচ্ছে, অথচ বাংলাদেশের আমদানিকারকরা সাধারণত ১০ থেকে ২০ হাজার টনের ছোট চালানে আগ্রহী। এতে বিক্রেতারা বড় ক্রেতাদের অগ্রাধিকার দিচ্ছেন।
এলপিজি কোম্পানিগুলো জানায়, আন্তর্জাতিক বাজারে অর্ডার দেওয়া থাকলেও অনেক সরবরাহকারী নির্দিষ্ট লোডিং তারিখ নিশ্চিত করতে পারছে না। কোথাও পুরো মাসজুড়ে বটলিং কার্যক্রম বন্ধ রাখতে হয়েছে। আবার কিছু কোম্পানি আগাম কেনা মজুত ব্যবহার করে সীমিত আকারে উৎপাদন চালিয়ে যাচ্ছে।
সংকট মোকাবেলায় সরকার সরকার-টু-সরকার (জিটুজি) চুক্তিতে এলপিজি আমদানির উদ্যোগ নিয়েছে। ফিলিপাইন থেকে ৮ থেকে ১০ দিনের মধ্যে কয়েক হাজার টন এলপিজি আনার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চলছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, দ্রুত এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত না হলে সংকট আরও দীর্ঘায়িত হতে পারে।
এদিকে জাহাজ সংকটে পরিবহণ ব্যয়ও বেড়েছে। আগে যেখানে প্রতি টন এলপিজি পরিবহণে ব্যয় ছিল প্রায় ১১০ ডলার, বর্তমানে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৮০ ডলারে। এর মধ্যেও দেশে বিদ্যমান মজুত এলপিজির অতিরিক্ত দামে বিক্রির অভিযোগ উঠেছে। বাজার তদারকিতে কার্যকর পদক্ষেপের অভাব নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন ভোক্তারা।
সব মিলিয়ে আমদানিতে ঘাটতি, বৈশ্বিক সরবরাহ সংকট, জাহাজ সমস্যার পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতায় এলপিজি সংকট থেকে দ্রুত উত্তরণের পথ এখনো অনিশ্চিত বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
















