মুহাম্মদ নেওয়াজ সিদ্দিকী কর্তৃক লিখিত এবং ডিপ্লোটিক বাংলা টিম কর্তৃক সম্পাদিত
আজ, বাংলা ক্যালেন্ডারের ১০ মাঘ, মাইজভান্ডারী তরিকার প্রতিষ্ঠাতা হজরত মাওলানা সৈয়দ আহমদ উল্লাহ মাইজভান্ডারী (রহ.)’র ওরস শরীফ। এই দিনটি লক্ষ লক্ষ ভক্তের জন্য আধ্যাত্মিক উল্লাসের প্রতীক, যেখানে প্রেম, শান্তি, ধৈর্য এবং মানবতার বাণী প্রতিধ্বনিত হয়। বিখ্যাত লেখক আহমদ ছফা তাঁর লেখায় মাইজভান্ডারী তরিকাকে বর্ণনা করেছেন এভাবে: “কোরান-হাদীসের শিক্ষা এবং পূর্ববর্তী সাধক-পুরুষদের যে সাধনা, প্রকৃতিগত দিক দিয়ে দেখতে গেলে মাইজভাণ্ডারী তরিকা তার একটি অগ্রবর্তী সম্প্রসারণ মাত্র।” আহমদ ছফার ‘অমৃতভান্ড মাইজভান্ডার’ প্রবন্ধে তিনি মাইজভান্ডারের সাংস্কৃতিক অবদানকেও উজ্জ্বল করেছেন, যা বিশেষত বাংলা সাহিত্য এবং সঙ্গীতকে সমৃদ্ধ করেছে।
মাইজভান্ডারী তরিকা এবং এর প্রতিষ্ঠাতার পরিচয়
মাইজভান্ডারী তরিকা বাংলাদেশের চট্টগ্রাম জেলার ফটিকছড়ি উপজেলায় অবস্থিত মাইজভান্ডার দরবার শরীফকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। এটি একটি সুফি তরিকা, যা ইসলামের মৌলিক নীতি “প্রেম, শান্তি, সহনশীলতা ও মানবতাবাদ”-এর উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। প্রতিষ্ঠাতা হজরত সৈয়দ আহমদ উল্লাহ মাইজভান্ডারী (রহ.) (জন্ম: ১৮২৬, পর্দা: ১৯০৬) একজন বিখ্যাত সুফি সাধক, যাঁকে ভক্তরা ‘গাউসুল আজম’ বলে সম্বোধন করেন। তিনি মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)’র বংশধর হিসেবে পরিচিত। আহমদ ছফা তাঁকে বর্ণনা করেছেন ইসলামের মূল শিক্ষার একটি জীবন্ত প্রসার হিসেবে, যা পূর্ববর্তী সাধকদের সাধনাকে অগ্রসর করে। তাঁর দর্শন ফানা (আত্মবিলয়) এবং ঐশ্বরিক প্রেমের উপর ভিত্তি করে, যা মানুষকে উগ্র-সাম্প্রদায়িকতা ও চরমপন্থা থেকে দূরে রাখে।
সাহিত্য এবং সঙ্গীতে মাইজভান্ডারের অবদান
আহমদ ছফা তাঁর লেখায় মাইজভান্ডারকে বাংলা সাহিত্য এবং সঙ্গীতের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে তুলে ধরেছেন। তিনি লিখেছেন: “মাইজভাণ্ডারী গানের কথা বাদ দিলে বাঙালীর সঙ্গীত-সাধনার প্রতি সুবিচার করা কখনো সম্ভব হবে না।” ‘অমৃতভান্ড মাইজভান্ডার’ প্রবন্ধে তিনি আরও বলেন যে, পীরেরা সরাসরি সাহিত্যচর্চা না করলেও, তাঁদের সাধনাকে উপলক্ষ করে উর্দু, ফার্সি, বাংলা এবং চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় হাজার হাজার গান রচিত হয়েছে। এই গানগুলো গজল, কাওয়ালি এবং গ্রাম্য সুরে রচিত, যা বাংলা সঙ্গীতকে সমৃদ্ধ করেছে। মাইজভান্ডারী গান ভাব, ভাষা, সুর এবং তালে অভিনব, যা বাঙালি সংস্কৃতির একটি বিশেষ ধারা। আহমদ ছফা জোর দিয়ে বলেন যে, এই গানগুলো বাংলার সঙ্গীতকে আশাতীতভাবে সমৃদ্ধ করেছে।
মাইজভান্ডারী দর্শন প্রকৃতি এবং সংগীতকে আধ্যাত্মিকতার সাথে অঙ্গাঙ্গীভাবে যুক্ত করে। বিজ্ঞানী ডেভিড বোহম বলেছেন, “Every particle of the universe is used their own mouth and own language”—প্রতিটি কণায় নিজস্ব ভাষা আছে। বিজ্ঞান স্বীকার করে যে, প্রতিটি বস্তু চলমান, এবং গতিতে ধ্বনি উৎপন্ন হয়। সূর্য থেকে আলোকরশ্মি, পৃথিবীর ঘূর্ণন—সবকিছুতে ধ্বনি। NASA-র ১৯৬৪ সালের CMBR যন্ত্রে এই ধ্বনি রেকর্ড করা হয়েছে, যা অং, ইং, উং ইত্যাদি স্বরবর্ণে প্রকাশ পায়। পৃথিবী ব্যঞ্জনবর্ণ তৈরি করে, চন্দ্র থেকে ‘আল্লাহ’ শব্দের মতো ধ্বনি আসে। প্রাচীন ঋষিরা এই ধ্বনি দিব্যজ্ঞানে শুনে সাত সুর, রাগ এবং রাগিণী সৃষ্টি করেন। সুর প্রাকৃতিক, তাই সংগীত আধ্যাত্মিক।
হজরত সৈয়দ আহমদ উল্লাহ (রহ.) প্রকৃতিতে সাধনা করে, গভীর অরণ্যে কাওয়ালি শুনতেন। কাওয়ালি সুফিদের আত্মার খোরাক, যা হৃদয়ে প্রশান্তি আনে। মাইজভান্ডারী দর্শন অনুযায়ী সেমা, কাওয়ালি, ঢোল এবং বাদ্যবাজনা স্রষ্টা স্মরণের মাধ্যম। ঢোলের তাল হৃদয়কে আন্দোলিত করে, পশুত্ব বিনাশ করে মানুষত্ব প্রস্ফুটিত করে। এই দর্শন চিশতিয়া ধারা থেকে উৎপত্তি বলে গণ্য করা হয়। অনেক মাওলানা, যেমন মুফতিয়ে আজম আবদুল হামিদ শাহ (রহ.), সৈয়দ আমিনুল হক শাহ (রহ.) প্রথমে নিষিদ্ধ মনে করলেও, পরে এর মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য লাভ করে স্বীকার করেন।
প্রকৃতি স্রষ্টার ইবাদতে লিপ্ত। কুরআনে বলা হয়েছে, বৃক্ষ সিজদা করে (সুরা আর-রহমান:৬), এবং প্রশংসা করে (সুরা নমল:৬০)। হজরত বৃক্ষ থেকে শিক্ষা নিয়ে নিঃস্বার্থ ইবাদত করতেন। সাহিত্যিকদের মতে সংগীত বৃক্ষের অনুভূতি জাগ্রত করে। মাইজভান্ডারী কালামে আছে: “বাঁশির সুরে উতাল-পাতাল করে আমার প্রাণ।”
হজরতের উন্মুক্ত দর্শন পরবর্তী আউলিয়াদের পথ সুগম করেছে, যেমন বাবা ভান্ডারী, শাহানশাহ জিয়াউল হক মাইজভান্ডারী, প্রমুখ। তাঁরা মজ্জুবে সালেক, যাঁরা প্রকৃতির ভাষা আয়ত্ত করে সৃষ্টির নিয়ন্ত্রণ করেন।
মাইজভান্ডারে প্রতি বছর ৮, ৯ এবং ১০ মাঘ তিন দিনব্যাপী এই মহান ব্যক্তিত্বের ওরস শরীফ উদযাপিত হয়। এতে লক্ষ লক্ষ ভক্ত দরবার শরীফে সমবেত হন, দোয়া, কাওয়ালি, গজল এবং সুফি সঙ্গীতের মাধ্যমে উদযাপন করেন। উদযাপনের মূল অংশ হলো মিলাদ মাহফিল, খতমে কুরআন, ফাতেহা এবং ভোজন (উরসের ভোজ)।
আজ ১০ এ মাঘ বাংলায় সুফি তরীকার অন্যতম প্রধান তরীকা মাইজভান্ডারের প্রতিষ্ঠাতা হজরত মাওলানা সৈয়দ আহমদ উল্লাহ মাইজভান্ডারী (রহ.) উরশ (মৃত্যুবার্ষিকী)। আজকের এই দিনে ডিপ্লোটিক পরিবার তাঁকে শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছে।

















