১৯৭০-এর দশকের গোড়ার দিকে বিশ্ব মুদ্রাব্যবস্থায় এক নীরব বিপ্লব ঘটে। ১৯৭১ সালে প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন ঘোষণা দেন যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আর ডলারের বিনিময়ে সোনা দেবে না। এর মাধ্যমে ব্রেটন উডস চুক্তির অবসান ঘটে। কিন্তু ডলারের আধিপত্য শেষ হয়ে যায়নি বরং এটি নতুন রূপ নিয়ে আত্মপ্রকাশ করে। ১৯৭৪ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের মধ্যে একটি গোপনীয় চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তির শর্ত ছিল অত্যন্ত সহজ কিন্তু সুদূরপ্রসারী—সৌদি আরব তাদের সমস্ত তেল শুধুমাত্র মার্কিন ডলারের বিনিময়ে বিক্রি করবে এবং বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র সৌদি আরবকে সামরিক সুরক্ষা দেবে। এর মাধ্যমেই জন্ম নেয় পেট্রোডলার ব্যবস্থা। তেল ছিল তখন শিল্পোন্নত বিশ্বের জীবন-রক্ত। ফলে জাপান, জার্মানি বা ফ্রান্সের মতো দেশগুলোকে তেল কিনতে হলে বিপুল পরিমাণ ডলার মজুত করতে হতো। অন্যদিকে সৌদি আরব তেল বিক্রি করে যে বিপুল ডলার আয় করত, তার অধিকাংশই পুনরায় মার্কিন ট্রেজারি বন্ড ও অন্যান্য আমেরিকান সম্পদে বিনিয়োগ করা হতো। এর ফলে একটি বদ্ধ চক্র তৈরি হয়—ডলার বিশ্ববাজারে ছড়িয়ে পড়ে আবার আমেরিকায় ফিরে আসে। পেট্রোডলার ব্যবস্থা ছিল মূলত একটি ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ। যুক্তরাষ্ট্র সৌদি আরবকে নিরাপত্তা ছাতা প্রদানের বিনিময়ে পায় অর্থনৈতিক আধিপত্য। এই সমীকরণ ধীরে ধীরে অন্যান্য উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গেও প্রসারিত হয়। কুয়েত, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত—সবাই এই ব্যবস্থার অন্তর্ভুক্ত হয়। পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে এই ব্যবস্থা টিকে আছে। কিন্তু এখন প্রশ্ন উঠছে, ইরানের সঙ্গে সম্ভাব্য একটি দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত কি এই ব্যবস্থার ভিত নাড়িয়ে দিতে পারে?
পারস্য উপসাগর বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথগুলোর একটি। হরমুজ প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন প্রায় দুই কোটি ব্যারেল অপরিশোধিত তেল পরিবাহিত হয়, যা বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ। কাতারের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের পুরোটাই এই পথে যায়। ইরানের সঙ্গে সংঘাত বাড়লে এই সংকীর্ণ সামুদ্রিক পথটি সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠবে। ইরান বারবার হুমকি দিয়েছে যে চরম পরিস্থিতিতে তারা এই প্রণালি বন্ধ করে দিতে পারে। এমনকি সরাসরি বন্ধ না করলেও ছোটখাটো সংঘর্ষ, মাইন বিছানো বা ট্যাংকার আটকের ঘটনা তেল সরবরাহে বিঘ্ন সৃষ্টি করতে পারে। ফলে তেলের দাম লাফিয়ে বাড়বে এবং জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হবে। কিন্তু এর চেয়েও বড় সমস্যা হলো এই অস্থিরতা পেট্রোডলার ব্যবস্থার ওপর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলতে পারে। কেননা তেল সরবরাহ অনিশ্চিত হয়ে পড়লে ক্রেতারা বিকল্প উৎসের সন্ধান করবে এবং সরবরাহকারীরাও ঝুঁকি কমাতে বৈচিত্র্য আনার চেষ্টা করবে। আর এই বৈচিত্র্যের অংশ হতে পারে মুদ্রার বৈচিত্র্যও।
গত দুই দশকে বিশ্ব জ্বালানি বাণিজ্যের মানচিত্র বদলে গেছে। বিংশ শতাব্দীর অধিকাংশ সময় জুড়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ ছিল তেলের সবচেয়ে বড় বাজার। কিন্তু বর্তমানে চীন বিশ্বের বৃহত্তম অপরিশোধিত তেল আমদানিকারকে পরিণত হয়েছে। ভারতও দ্রুত এগিয়ে আসছে। উপসাগরীয় তেলের প্রধান গন্তব্য এখন এশিয়া। এই পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে মুদ্রা ব্যবস্থারও পরিবর্তন আসাটা স্বাভাবিক। চীন দীর্ঘদিন ধরেই চেষ্টা করছে তাদের মুদ্রা ইউয়ানকে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিষ্ঠিত করতে। ২০১৮ সালে সাংহাই ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি এক্সচেঞ্জে ইউয়ান-ভিত্তিক তেল লেনদেন চালু হয়েছে। যদিও এর পরিমাণ এখনো সামগ্রিক বাণিজ্যের তুলনায় নগণ্য, কিন্তু এটি একটি শুরু। রাশিয়া ও ইরানের ওপর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা জোরদার হওয়ার পর তারা ডলার-বহির্ভূত লেনদেনের পথ খুঁজছে। চীন ও রাশিয়া নিজেদের মধ্যে বাণিজ্যে ডলারের ব্যবহার কমিয়ে এনেছে এবং স্থানীয় মুদ্রায় লেনদেন বাড়িয়েছে। ভারতও কিছু কিছু ক্ষেত্রে সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে রুপিতে লেনদেনের উদ্যোগ নিয়েছে। ইরানের সঙ্গে বড় কোনো সংঘাত শুরু হলে এই প্রক্রিয়া আরও ত্বরান্বিত হতে পারে। কারণ সংঘাতের ফলে ডলার-ভিত্তিক ব্যবস্থায় যে অনিশ্চয়তা তৈরি হবে, তা থেকে বেরিয়ে আসার পথ খুঁজবে বিভিন্ন দেশ। ইরান নিজেও তো বটেই, ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য করতে আগ্রহী অন্য দেশগুলোর জন্যও ডলার-নির্ভরতা একটি সমস্যা হয়ে দাঁড়াতে পারে। তাই তারা ক্রমান্বয়ে বিকল্প মুদ্রার দিকে ঝুঁকতে পারে।
নিষেধাজ্ঞা একটি শক্তিশালী অস্ত্র। যুক্তরাষ্ট্র বারবার ইরানের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে, যা ইরানের তেল রপ্তানি প্রায় শূন্যের কোঠায় নামিয়ে এনেছে। কিন্তু নিষেধাজ্ঞার আরেকটি ফলাফল হলো, যেসব দেশ নিষেধাজ্ঞার মুখোমুখি হয় তারা স্বাভাবিকভাবেই বিকল্প ব্যবস্থা তৈরি করতে উদ্বুদ্ধ হয়। ইরান এর ব্যতিক্রম নয়। তারা বছরের পর বছর ধরে নিষেধাজ্ঞা মোকাবিলা করে বাণিজ্য চালিয়ে যাওয়ার কৌশল তৈরি করেছে। পণ্য বিনিময়, স্থানীয় মুদ্রায় লেনদেন, মধ্যস্বত্ত্বভোগী দেশ ব্যবহার করে বাণিজ্য—এসব পদ্ধতি তারা প্রয়োগ করেছে। দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত শুরু হলে এই বিকল্প ব্যবস্থাগুলো আরও পরিশীলিত ও বিস্তৃত হবে। কেবল ইরানই নয়, অন্য অনেক দেশও উপলব্ধি করবে যে ডলারের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা ঝুঁকিপূর্ণ। বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ তাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে ডলারের অংশ কমাচ্ছে এবং সোনা বা অন্যান্য মুদ্রার পরিমাণ বাড়াচ্ছে। এই প্রবণতা ইতোমধ্যেই শুরু হয়েছে এবং সংঘাত তা ত্বরান্বিত করবে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের তথ্য বলছে, গত দুই দশকে ডলারের অংশ বৈশ্বিক রিজার্ভে ধীরে ধীরে কমছে। ২০০০ সালে যেখানে ডলারের অংশ ছিল ৭০ শতাংশের বেশি, এখন তা প্রায় ৫৮ শতাংশে নেমে এসেছে। এটি একটি ধীর প্রক্রিয়া, কিন্তু ধারাবাহিক।
পেট্রোডলার ব্যবস্থা কেবল একটি অর্থনৈতিক কাঠামো নয়, এটি সামরিক নিরাপত্তার ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা একটি ভূ-রাজনৈতিক কাঠামোও বটে। যুক্তরাষ্ট্র উপসাগরীয় দেশগুলোকে নিরাপত্তা দেয়, বিনিময়ে তারা ডলারে তেল বিক্রি করে এবং সেই ডলার পুনরায় আমেরিকায় বিনিয়োগ করে। ইরানের সঙ্গে বড় কোনো সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পৃক্ততা বাড়লে এই নিরাপত্তা কাঠামোয় ফাটল ধরতে পারে। এক্ষেত্রে দুটি সমস্যা দেখা দিতে পারে। প্রথমত, সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ব্যভার ব্যাপক বাড়বে, যা তার অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করবে। দ্বিতীয়ত, সংঘাত যদি সরাসরি ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সংঘাতে রূপ নেয়, তবে উপসাগরীয় অঞ্চলের অন্যান্য দেশও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে গেলে সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার, ইরাক ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের তেল রপ্তানি বাধাগ্রস্ত হবে। এই দেশগুলোর আর্থিক স্থিতিশীলতা তখন হুমকির মুখে পড়বে। এমন পরিস্থিতিতে তারা কি ডলার-ভিত্তিক ব্যবস্থার প্রতি পূর্বের মতোই আনুগত্য দেখাবে? নাকি নিজেদের স্বার্থে বিকল্প পথ খুঁজবে? অনেক বিশ্লেষকের মতে, উপসাগরীয় দেশগুলো ইতোমধ্যেই তাদের অর্থনীতির বৈচিত্র্য আনার চেষ্টা করছে এবং চীনের সঙ্গেও সম্পর্ক গভীর করছে। সৌদি আরবের ভিশন ২০৩০ পরিকল্পনা এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের অর্থনৈতিক কৌশল তেল-নির্ভরতা কমানোর লক্ষ্যেই তৈরি। এই প্রক্রিয়ায় ডলারের ওপর নির্ভরতা কমানোর বিষয়টিও থাকতে পারে।
তবে ডলারের পতন এখনই হবে—এমন ধারণা অত্যন্ত বাড়াবাড়ি। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি এখনো বিশ্বের সবচেয়ে বড় এবং এর আর্থিক বাজার সবচেয়ে গভীর ও তারল্যপূর্ণ। বিশ্বের বেশিরভাগ বড় কর্পোরেশন, ব্যাংক ও বিনিয়োগকারী এখনো ডলারকেই সবচেয়ে নিরাপদ সম্পদ মনে করে। মার্কিন ট্রেজারি বন্ডকে ঝুঁকিমুক্ত বিনিয়োগ হিসেবে দেখা হয়। চীন, জাপান ও অন্যান্য দেশ বিপুল পরিমাণ ট্রেজারি বন্ড ধারণ করে আছে। হুট করে এই ব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে আসা তাদের জন্যও কঠিন হবে। কারণ এর ফলে তাদের হাতে থাকা ডলার-সম্পদের মূল্য হ্রাস পেতে পারে। তাই ধীরে ধীরে পরিবর্তনই বেশি সম্ভাবনাময়। আগামী দুই এক দশকে আমরা হয়তো একটি বহুমেরুভিত্তিক মুদ্রাব্যবস্থার দিকে এগিয়ে যাব। ডলার হয়তো তার শীর্ষ অবস্থান ধরে রাখবে, কিন্তু তার পাশাপাশি ইউয়ান, ইউরো এবং সম্ভবত কোনো ডিজিটাল মুদ্রাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে শুরু করবে। ইরান সংঘাত এই পরিবর্তনের গতি বাড়াতে পারে, কিন্তু এককভাবে এটি ডলারের পতন ঘটাবে না।
মুসলিম বিশ্বের জন্য এই পরিবর্তনের তাৎপর্য অনেক। উপসাগরীয় দেশগুলো দীর্ঘকাল ধরে মুসলিম বিশ্বের অর্থনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে কাজ করেছে। দুবাই, দোহা, রিয়াদ ও আবুধাবি শুধু তেলসমৃদ্ধ শহর নয়, এগুলো আন্তর্জাতিক অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। এই অঞ্চলে স্থিতিশীলতা বজায় থাকলে পুরো মুসলিম বিশ্ব তার সুফল পায়। আবার অস্থিরতা শুরু হলে তা দ্রুত অন্য দেশেও ছড়িয়ে পড়ে। আর্থিক ব্যবস্থার বিবর্তনের এই পর্যায়ে মুসলিম দেশগুলোর জন্য চ্যালেঞ্জ হলো নিজেদের স্বার্থ সংরক্ষণ করা। একদিকে তাদের যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঐতিহ্যগত সম্পর্ক রয়েছে, অন্যদিকে চীন ও এশিয়ার উদীয়মান অর্থনীতিগুলোর সঙ্গেও সম্পর্ক গভীর হচ্ছে। এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রাখা কঠিন কিন্তু জরুরি। ইরান সংঘাত এই ভারসাম্য বজায় রাখার কাজকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। কেননা এই সংঘাতে সরাসরি জড়িয়ে পড়লে উপসাগরীয় দেশগুলোকে এক পক্ষ বেছে নিতে হতে পারে, যা তাদের কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতাকে সীমিত করে দেবে।
পেট্রোডলার ব্যবস্থার পতন কোনো রাতারাতি ঘটনা নয়। এটি ধীরে ধীরে ঘটে, প্রায় অদৃশ্যভাবে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, আর্থিক ব্যবস্থা পরিবর্তিত হয় যখন ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা পরিবর্তিত হয়। ব্রিটিশ পাউন্ডের পতন একদিনে হয়নি, ডাচ গিল্ডারের পতনও ধীরে ধীরে হয়েছে। ডলারের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটতে পারে। ইরান সংঘাত সেই প্রক্রিয়ার অনুঘটক হিসেবে কাজ করতে পারে। এটি পেট্রোডলার ব্যবস্থার দুর্বলতা ও সীমাবদ্ধতাগুলোকে উন্মোচিত করে দিতে পারে। আগামী বছরগুলোতে আমরা হয়তো ডলারের আধিপত্যের ক্রমান্বয়ে হ্রাস দেখতে পাব। কিন্তু তার মানে এই নয় যে বিশৃঙ্খলা তৈরি হবে। বরং একটি নতুন, আরও বহুমুখী আর্থিক ব্যবস্থার উদ্ভব ঘটবে। সেই ব্যবস্থায় হয়তো ডলার থাকবে শীর্ষে, কিন্তু তার পাশাপাশি অন্য মুদ্রাগুলোও নিজেদের অবস্থান তৈরি করবে। বিশ্ব অর্থনীতি তখন আরও সুষম ও বহুমাত্রিক হয়ে উঠতে পারে।















