বাংলাদেশের অর্থনীতিতে যখন উচ্চহারে মূল্যস্ফীতি বাড়ছে, বৈদেশিক মুদ্রার সংকট বিদ্যমান এবং ক্রমবর্ধমানহারে আয় বৈষম্যের যে চাপ তা বৃদ্ধি পেয়েছে, ঠিক তখনি রাজনৈতিক দলগুলোর জনকল্যাণমূলক প্রতিশ্রুতি নতুন করে আলোচনায় আসাটাই স্বাভাবিক। সেই প্রেক্ষাপটে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান এর দেয়া ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচি জনগণের মনে আশা যেমন তৈরি করেছে তেমনি প্রশ্নও তৈরি করেছে—এটি কি সত্যিকারের অর্থনৈতিক সমাধান নাকি জনপ্রিয়তা অর্জনের আরেকটি রাজনৈতিক প্রলোভন।
কি আছে এই ফ্যামিলি কার্ডে?
ফ্যামিলি কার্ড সম্পর্কে একটা স্বচ্ছ ধারণা পেতে পারি আমরা-
বিএনপি থেকে নেয়া প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে নির্দিষ্ট আয়ের নিচে থাকা প্রায় ৪ কোটি পরিবারকে মাসিক দুই হাজার থেকে আড়াই হাজার টাকা প্রনোদনা অথবা সমমূল্যের খাদ্যপণ্য দেয়া হবে। এই ফ্যামিলি কার্ডটি ইস্যু করা হবে পরিবারের গৃহিণীর নামে।
বিএনপি থেকে বলা হয়েছে, এই ফ্যামিলি কার্ডের উদ্দেশ্য —নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের খাদ্য ও জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো এবং মূল্যস্ফীতির থেকে তাদের কিছুটা স্বস্তি দেওয়া। অর্থনীতির ভাষায় এটিকে বলা হয় টার্গেটেড সোশ্যাল সেফটি নেট প্রোগ্রাম, যা সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে সরাসরি দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কল্যাণে ভূমিকা রাখতে পারে।
সংকটের বাস্তবতা ও প্রতিশ্রুতির রাজনীতি
দেশের চলমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় দেশের একটি বড় অংশের মানুষের আয় স্থবির আছে অথচ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম লাগামছাড়া। এই অবস্থায় ফ্যামিলি কার্ডের মতো একটি প্রস্তাব নিঃসন্দেহে রাজনৈতিকভাবে আকর্ষণীয়। কারণ এতে সরাসরি ভোটারদের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে যুক্ত একটি প্রতিশ্রুতি দেওয়া হচ্ছে।
কিন্তু অর্থনীতির উন্নয়ন এসব জনপ্রিয় স্লোগানে কিংবা প্রতিশ্রুতিতে হয়না । প্রশ্ন হলো—এই কর্মসূচি বাস্তবায়নের পেছনে অর্থনৈতিক পরিকল্পনা কতটা সুস্পষ্ট?
স্বল্পমেয়াদি স্বস্তি, দীর্ঘমেয়াদি অনিশ্চয়তা?
ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে যদি নিম্নআয়ের পরিবারগুলো স্বল্পমূল্যে চাল, ডাল, তেলসহ নিত্যপণ্য পায়, তাহলে তা নিঃসন্দেহে স্বল্পমেয়াদে স্বস্তি দেবে। এতে জীবনযাত্রার ব্যয় সাময়িকভাবে কমবে এবং সামাজিক চাপ কিছুটা প্রশমিত হবে।
কিন্তু এই স্বস্তি স্থায়ী নয়। কারণ মূল্যস্ফীতির মূল কারণ—উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, সরবরাহ সংকট, আমদানিনির্ভরতা ও বাজার ব্যবস্থার দুর্বলতা—এই কর্মসূচির মাধ্যমে সমাধান হয় না। বরং ভর্তুকিনির্ভর ব্যবস্থাকে দীর্ঘায়িত করলে বাজার আরও বিকৃত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
বাজেটের ভার বইবে কে?
‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে হলে প্রয়োজন বিপুল পরিমাণ সরকারি অর্থ। প্রশ্ন হলো—এই অর্থ আসবে কোথা থেকে? বাংলাদেশের রাজস্ব আদায় স্বাভাবিকভাবেই জিডিপির তুলনায় অনেক কম। এমতাবস্থায় নতুন একটি বড় সামাজিক কর্মসূচি চালু মানেই হয় নতুন করে ঋণ নেওয়া, নয়তো অন্যান্য উন্নয়ন ব্যয় কাটছাঁট করা।
অতিরিক্ত ঋণ গ্রহণ শেষ পর্যন্ত মুদ্রাস্ফীতির আগুনেই ঘি ঢালতে পারে। তখন যে জনগোষ্ঠীকে রক্ষা করার জন্য ফ্যামিলি কার্ড চালু করা হবে, তারাই আবার মূল্যস্ফীতির নতুন ঢেউয়ের শিকার হবে। যদিও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, সরকারের বিভিন্ন সামাজিক কর্মসূচির প্রজেক্ট থেকে সমন্বয় করা হবে। সরকারের ১৩৮ টি প্রকল্প থেকে এই সমন্বয় করা হবে বলে জানান তিনি। প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ৪ কোটি পরিবারকে প্রতি মাসে অন্তত ২ হাজার টাকা করে ভর্তুকি বা প্রণোদনা দেয়া হয় সেক্ষেত্রে বছর শেষে সেটি দাঁড়াবে প্রায় ৯৬ হাজার কোটি টাকা। যদিও ধাপে ধাপে এই কর্মসূচি বাস্তবায়নের কথা বলেছেন বিএনপির চেয়ারম্যান জনাব তারেক রহমান।
লক্ষ্যভ্রষ্ট হলে কর্মসূচি ফলপ্রসূ হবে না
বাংলাদেশে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো লাভবান নির্বাচন। কারা প্রকৃত দরিদ্র, কারা সুবিধা পাবে—এই সিদ্ধান্তে বারবার ব্যর্থতার নজির রয়েছে। রাজনৈতিক সুপারিশ, দলীয় প্রভাব ও প্রশাসনিক দুর্বলতার কারণে বহু কর্মসূচি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়েছে।
ফ্যামিলি কার্ডও যদি একই পথে হাঁটে, তাহলে এটি দরিদ্রবান্ধব কর্মসূচি না হয়ে রাজনৈতিক প্রভাবযুক্ত কর্মসূচিতে পরিণত হবে। যাতে করে এই কর্মসূচির লক্ষ্য ব্যর্থ হবে। কর্মসূচি ফলপ্রসূ হবে না।
উৎপাদন বৃদ্ধি না করে ভোগেই ভর্তুকি
অর্থনীতির একটি মৌলিক সত্য হলো—দীর্ঘমেয়াদে ভোগে ভর্তুকি দিয়ে দারিদ্র্য দূর করা যায় না। দারিদ্র্য দূর করতে হলে দরকার কর্মসংস্থান, উৎপাদনশীলতা ও আয় বৃদ্ধি।
ফ্যামিলি কার্ড মূলত ভোগকেন্দ্রিক একটি প্রস্তাব। এতে উৎপাদন বাড়ানোর কোনো স্পষ্ট দিকনির্দেশনা নেই। কৃষক, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা বা শিল্পখাত—কোনো ক্ষেত্রেই কাঠামোগত সংস্কারের কথা এতে উঠে আসে না। ফলে এটি দারিদ্র্য ব্যবস্থাপনার একটি উপায় হতে পারে, কিন্তু দারিদ্র্য নিরসনের সমাধান নয়।
অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা বনাম রাজনৈতিক জনপ্রিয়তা
ফ্যামিলি কার্ডের মতো কর্মসূচি রাজনৈতিকভাবে লাভজনক, কেননা নির্বাচনে ভোটারদের আকর্ষণ পেতে এটি ট্রাম্প কার্ড হতে পারে। কিন্তু অর্থনৈতিকভাবে তা ঝুঁকিপূর্ণ বলা যায়—যদি তা সুপরিকল্পিত না হয়। নির্বাচনী রাজনীতিতে এমন প্রতিশ্রুতি নতুন নয় বাংলাদেশে । অতীতের অভিজ্ঞতা বলে, অনেক ক্ষেত্রেই এসব কর্মসূচি ক্ষমতায় যাওয়ার পর বাস্তবতার মুখে পড়লে হয় সীমিত আকারে বাস্তবায়িত হয়, নয়তো নীরবে পরিত্যক্ত হয়।
ফলে জনগণের মধ্যে প্রত্যাশা তৈরি করে তা পূরণে ব্যর্থ হলে রাষ্ট্র ও রাজনীতির প্রতি অনাস্থাই বাড়ে।
বিএনপি থেকে প্রস্তাবিত ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি বলে অনেকে মনে করেন । হতে পারে এটি বর্তমান সংকটে মানুষের দুঃখ-কষ্টের বাস্তবতাকে স্বীকার করে নেওয়ার একটি প্রচেষ্টা। তবে দেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতায় এটি কোনো স্থায়ী সমাধান হতে পারে না। যেকোনো কর্মসূচি একটি দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা ও বাস্তবতার সাথে সামঞ্জস্যতা না থাকলে সেই কর্মসূচি মুখ থুবড়ে পড়ে থাকার সম্ভাবনাই বেশি। এখন দেখার বিষয়, এটি কি নির্বাচন কেন্দ্রিক প্রতিশ্রুতি নাকি সত্যিকার অর্থে জনগণের সামাজির সুরক্ষার বিষয় নিশ্চিত করবে। এজন্য অপেক্ষা করতে হবে নির্বাচন পরবর্তী সময়ের জন্য।
















