২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া এই সংঘাত এখন পুরো অঞ্চলকে ছুঁয়েছে। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি প্রথম দিকেই নিহত হয়েছেন। তারপর থেকে আরও অনেক নেতা প্রাণ হারিয়েছেন। লেবানন, ইরাক এবং উপসাগরীয় দেশগুলোতেও হামলা ছড়িয়ে পড়েছে। ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিয়েছে, যার ফলে বিশ্বব্যাপী জ্বালানির দাম বেড়েছে এবং সরবরাহে বড় সমস্যা তৈরি হয়েছে। এখন পর্যন্ত দুই হাজারেরও বেশি মানুষ মারা গেছেন, যাদের মধ্যে অনেক বেসামরিক নাগরিক এবং শিশু রয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একদিকে ইরানের কাছে আত্মসমর্পণ দাবি করছেন, অন্যদিকে মিত্রদের সাহায্য চাইছেন প্রণালি খুলতে। এই অবস্থায় সবাই জানতে চাইছে, এই যুদ্ধ ঠিক কোন পথে শেষ হবে। বিশ্লেষকরা কয়েকটি সম্ভাব্য দৃশ্যপটের কথা বলছেন, যা রাজনীতি, অর্থনীতি এবং আঞ্চলিক সম্পর্কের ওপর নির্ভর করছে।
ট্রাম্প কি দ্রুত বিজয় ঘোষণা করে যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসবেন?
যুদ্ধের শুরুতে ট্রাম্প বলেছিলেন যে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস করাই মূল লক্ষ্য। পরে তিনি মিসাইল সক্ষমতা এবং নৌবাহিনী নিশ্চিহ্ন করার কথা বলেন। এখন লক্ষ্য আরও বড় হয়েছে, যেমন ইসলামি শাসনব্যবস্থার আত্মসমর্পণ। কিন্তু এই পরিবর্তনের পেছনে অভ্যন্তরীণ চাপ রয়েছে। ২০২৬ সালের নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন হবে। রিপাবলিকান দলের অনেক নীতিনির্ধারক মনে করেন, যুদ্ধ যদি দীর্ঘ হয় এবং মার্কিন সেনাদের মৃত্যু বাড়তে থাকে তাহলে নির্বাচনে সমস্যা হবে। এরই মধ্যে তেলের দাম বেড়েছে এবং হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল অনেক কমে গেছে। এতে মার্কিন অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরি হয়েছে, যা ট্রাম্পের জন্য রাজনৈতিক ঝুঁকি।
অতীতে অনেক যুদ্ধে দেখা গেছে যে নেতারা লক্ষ্য অর্জিত বলে ঘোষণা করে দ্রুত বেরিয়ে আসেন। ইরানের অনেক সামরিক স্থাপনা ইতিমধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ট্রাম্প হয়তো বলবেন যে পারমাণবিক এবং মিসাইল সাইটগুলো ধ্বংস করা হয়েছে এবং এটাই যথেষ্ট। এরপর তিনি মার্কিন বাহিনীকে ফিরিয়ে আনার পথ খুঁজতে পারেন। এতে দেশের ভেতরে সমর্থন বাড়বে এবং অর্থনৈতিক চাপ কমবে। তবে এই পথের ঝুঁকি আছে। যদি ইরান আবার শক্তি সংগ্রহ করে তাহলে পরে নতুন সমস্যা তৈরি হতে পারে। আঞ্চলিক দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কও প্রভাবিত হবে। সব মিলিয়ে এই দৃশ্যপটে যুদ্ধ শেষ হওয়ার সম্ভাবনা আছে, কিন্তু তা নির্ভর করবে ট্রাম্পের রাজনৈতিক হিসাব এবং মিত্রদের চাপের ওপর। বিশ্লেষকরা বলছেন, অভ্যন্তরীণ চাপ যত বাড়বে ট্রাম্প তত দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। এই পথটি বাস্তবে কাজ করলে মধ্যপ্রাচ্যে সাময়িক শান্তি ফিরতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে ইরানের প্রতিক্রিয়া কী হয় তা দেখতে হবে।
ইরানে ক্ষমতা পরিবর্তনের মতো কোনো মডেল কি কাজ করবে?
কিছু বিশ্লেষক ভেনেজুয়েলার উদাহরণ দেখিয়ে বলছেন যে ইরানেও হয়তো এমন কিছু ঘটতে পারে। সেখানে মার্কিন বাহিনী প্রেসিডেন্টকে সরিয়ে ভাইস প্রেসিডেন্টকে ক্ষমতায় আনার পর শর্ত মেনে নেওয়া হয় এবং নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়। কিন্তু ইরানের ক্ষেত্রে এই পথটি কঠিন। খামেনি নিহত হওয়ার পর বিশেষজ্ঞ পরিষদ তার ছেলে মোজতবা খামেনিকে নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে। মোজতবা নিজেও আহত হয়েছিলেন এবং তার পরিবারের অনেক সদস্য প্রাণ হারিয়েছেন। তবু শাসনব্যবস্থা এখনও চলছে।
ইরানের শাসন কাঠামো ভেনেজুয়েলার থেকে আলাদা। এখানে ধর্মীয় নেতৃত্ব এবং বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর শক্তি অনেক বেশি। জনগণের মধ্যে জাতীয় ঐক্য এখন বেড়েছে কারণ বাইরের হামলা সবাইকে এক করে দিয়েছে। অতীতে অর্থনৈতিক সমস্যায় যে আন্দোলন ছিল তা এখন কমে গেছে। মার্কিন বাহিনী যদি নেতৃত্বকে সরিয়ে নতুন কাউকে বসাতে চায় তাহলে বড় প্রতিরোধের মুখে পড়তে হবে। এছাড়া ইরানের ভৌগোলিক অবস্থান এবং প্রক্সি নেটওয়ার্ক এই ধরনের পরিবর্তনকে জটিল করে তোলে। বিশ্লেষকরা মনে করেন, এই মডেল ইরানে প্রয়োগ করা কঠিন কারণ দেশটির অভ্যন্তরীণ কাঠামো শক্তিশালী। যদি কোনো পরিবর্তন হয় তাহলে তা হবে ধীরে ধীরে এবং অনেক আলোচনার পর। এই পথে যুদ্ধ শেষ হলে ইরানের সঙ্গে নতুন সম্পর্ক গড়া সম্ভব, কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে এর সম্ভাবনা কম। এতে দেখা যাচ্ছে যে প্রতিটি দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থা আলাদা, তাই এক দেশের মডেল অন্য দেশে সহজে কাজ করে না।
যুদ্ধবিরতি বা শান্তি চুক্তির কোনো বাস্তব পথ আছে কি?
যুদ্ধবিরতির কথা উঠলেও বাস্তবে তা খুব কঠিন। ট্রাম্প প্রশাসন যে শর্ত দিচ্ছে তাতে ইরানের মিসাইল সক্ষমতা এবং প্রক্সি গোষ্ঠীগুলো পুরোপুরি বন্ধ করতে হবে। এগুলো ইরানের সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন যে দেশটি নিজের সুরক্ষায় একাই লড়তে পারে এবং কারও কাছে মাথা নত করবে না। উভয় পক্ষই এই যুদ্ধকে নিজেদের অস্তিত্বের লড়াই হিসেবে দেখছে।
অতীতে মধ্যপ্রাচ্যে অনেক যুদ্ধবিরতি হয়েছে, কিন্তু সেগুলোতে উভয় পক্ষের সম্মতি ছিল। এখানে শর্তগুলো এত কঠিন যে ইরানের নেতৃত্ব এবং জনগণ উভয়েই তা মেনে নেবে না। যদি কোনো বিরতি হয় তাহলে তা সাময়িক হতে পারে এবং পরে আবার সংঘাত শুরু হতে পারে। এছাড়া লেবাননের হিজবুল্লাহ এবং অন্যান্য গোষ্ঠী জড়িয়ে পড়ায় যুদ্ধবিরতি আরও জটিল। বিশ্লেষকরা বলছেন, যুদ্ধবিরতির জন্য আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতা দরকার, কিন্তু বর্তমানে তেমন কোনো সক্রিয় প্রচেষ্টা দেখা যাচ্ছে না। এই পথটি যদি খোলে তাহলে অঞ্চলের অর্থনীতি স্থিতিশীল হবে এবং মানুষের ক্ষয়ক্ষতি কমবে। কিন্তু শর্ত নিয়ে মতভেদ বড় বাধা। সব মিলিয়ে এই দৃশ্যপটের সম্ভাবনা কম, তবে যদি চাপ বাড়ে তাহলে কোনো আপস হতে পারে।
দীর্ঘমেয়াদী আঞ্চলিক সংঘাত কি এড়ানো যাবে?
সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো যুদ্ধ যদি শুধু ইরানে আটকে না থেকে পুরো মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়ে। ইরান একা লড়ছে না। লেবাননের হিজবুল্লাহ, ইয়েমেনের হুথি এবং ইরাকের মিলিশিয়া গোষ্ঠী জড়িয়ে পড়েছে। ইসরায়েল লেবাননে হামলা চালাচ্ছে এবং দীর্ঘ লড়াইয়ের কথা বলছে। ট্রাম্পের লক্ষ্য বারবার বদলাচ্ছে এবং রিপাবলিকান দলের ভেতরেও মতভেদ দেখা দিয়েছে। কিছু বিশ্লেষক যুদ্ধের সমালোচনা করছেন। এতে যুক্তরাষ্ট্র কতদিন এই যুদ্ধে থাকবে তা অনিশ্চিত।
অতীতে এই অঞ্চলে দীর্ঘ যুদ্ধগুলো অর্থনীতি এবং জনজীবনকে বড় ক্ষতি করেছে। এখন হরমুজ বন্ধ থাকায় বিশ্বব্যাপী প্রভাব পড়ছে। যদি যুদ্ধ দীর্ঘ হয় তাহলে আরও দেশ জড়াবে এবং মানুষের ক্ষয়ক্ষতি বাড়বে। ইরানের নতুন নেতৃত্ব কতদিন চাপ সহ্য করতে পারে তা দেখার বিষয়। যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এখানে বড় ভূমিকা রাখবে। এই দৃশ্যপটে যুদ্ধ শেষ হতে সময় লাগবে এবং তা অনেক রক্তক্ষয়ী হতে পারে। তবে যদি কোনো পক্ষ আপস করে তাহলে এটি এড়ানো যেতে পারে। সবকিছু মিলিয়ে এই ঝুঁকি এখন সবচেয়ে বেশি।
এই যুদ্ধ শেষ হলে মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ অনেকাংশে নির্ভর করবে কোন দৃশ্যপট বাস্তব হয় তার ওপর। অতীতের সংঘাত থেকে শিক্ষা নিয়ে যদি সব পক্ষ সতর্ক থাকে তাহলে অঞ্চলটি আবার স্থিতিশীল হতে পারে। অন্যথায় জ্বালানি সংকট এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা দীর্ঘদিন চলবে, যা পুরো বিশ্বকে প্রভাবিত করবে।















