দেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের গত ১৭ মাসে মানবাধিকার পরিস্থিতি ছিল গভীরভাবে উদ্বেগজনক—এমন চিত্র উঠে এসেছে হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস)-এর সর্বশেষ প্রতিবেদনে। সংস্থাটির হিসাব অনুযায়ী, এই সময়ে রাজনৈতিক সংঘাত ও ‘মব ভায়োলেন্সে’ মোট ৪৫৪ জন প্রাণ হারিয়েছেন।
বুধবার জাতীয় প্রেসক্লাবে আয়োজিত ‘জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী মানবাধিকার পরিস্থিতি ও প্রাক্-নির্বাচনী সহিংসতা’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করেন এইচআরএসএসের নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম। প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ১৭ মাসে দেশে রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে মোট ১ হাজার ৪১১টি। এসব ঘটনায় ১৯৫ জন নিহত হয়েছেন, আর গণপিটুনি বা মব ভায়োলেন্সে প্রাণ গেছে আরও ২৫৯ জনের।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাজনৈতিক সহিংসতার বড় অংশই ঘটেছে দলগুলোর অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে। বিশেষ করে বিএনপির অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব থেকেই সংঘটিত হয়েছে সহিংসতার অর্ধেকের বেশি ঘটনা। এই সময় দলটির ভেতরের ৭০৪টি সংঘর্ষে নিহত হয়েছেন ১২১ জন এবং আহত হয়েছেন ৭ হাজার ১৩১ জন। এছাড়া বিএনপি–জামায়াত সংঘর্ষে ৩ জন এবং বিএনপি–আওয়ামী লীগ সংঘাতে ২১ জন নিহত হওয়ার তথ্য নথিভুক্ত করেছে সংস্থাটি।
সংবাদ সম্মেলনে মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন জুলাই অভ্যুত্থানের পর দায়ের হওয়া ‘ঢালাও মামলাগুলো’ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ভিকটিম পরিবারকে সামনে রেখে একটি অসাধু চক্র মনগড়া মামলা দায়ের করছে, যেখানে ব্যবসায়ী, সমাজের বিশিষ্ট ব্যক্তি ও ভিন্নমতের মানুষদের টার্গেট করা হচ্ছে। এসব মামলাকে ঘিরে চাঁদাবাজি ও মামলাবাণিজ্যও চলছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
নির্বাচনী সহিংসতার চিত্র তুলে ধরে প্রতিবেদনে বলা হয়, গত বছরের ১১ ডিসেম্বর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকে চলতি বছরের ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত ১৬২টি নির্বাচনী সহিংসতার ঘটনায় অন্তত ৫ জন নিহত এবং ৯৭০ জন আহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলে প্রাণ গেছে ৩ জনের।
‘মব ভায়োলেন্স’কে প্রতিবেদনে অন্যতম গুরুতর সংকট হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই সময়ে ৪১৩টি গণপিটুনির ঘটনায় নিহত হয়েছেন ২৫৯ জন এবং আহত হয়েছেন ৩১৩ জন। চোর সন্দেহে মানসিক ভারসাম্যহীন ব্যক্তিকে হত্যা থেকে শুরু করে রাজনৈতিক প্রতিহিংসায় পিটিয়ে হত্যার ঘটনাও নথিভুক্ত হয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে ও নির্যাতনে ৬০ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে জানানো হয়। একই সময়ে কারাগারে মৃত্যু হয়েছে ১২৭ জন আসামির, যার মধ্যে ৪৪ জন ছিলেন কয়েদি। কয়েকটি মৃত্যুকে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড বলে অভিযোগ করেছে সংশ্লিষ্ট পরিবারগুলো।
গণমাধ্যম পরিস্থিতিও ছিল উদ্বেগজনক। প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ১৭ মাসে সাংবাদিকদের ওপর ৪২৭টি হামলার ঘটনায় ৬ জন নিহত এবং ৮৩৪ জন নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। এ সময় প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারের কার্যালয়ে হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটেছে।
নারী, শিশু ও সংখ্যালঘুদের ওপর সহিংসতার চিত্র তুলে ধরে প্রতিবেদনে বলা হয়, এই সময়ে ২ হাজার ৬১৭ জন নারী ও শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ১ হাজার ১৬ জন এবং সহিংসতায় নিহত হয়েছেন ৪৭৮ জন শিশু। ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর ৫৬টি হামলায় ১ জন নিহত ও ২৭ জন আহত হন; ভাঙচুর করা হয় মন্দির, প্রতিমা, বাড়ি ও মাজার।
সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয় প্রতিবেদনে। ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর গুলিতে ও নির্যাতনে ৪৩ জন বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন। পাশাপাশি কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনা ও সহিংসতায় প্রাণ গেছে ১৬৪ জন শ্রমিকের।
সংবাদ সম্মেলনে এইচআরএসএস মানবাধিকার রক্ষায় সরকারের আরও জবাবদিহিমূলক, স্বচ্ছ ও কার্যকর ভূমিকার আহ্বান জানায়। অনুষ্ঠানে সংগঠনের অন্যান্য কর্মকর্তারাও উপস্থিত ছিলেন।














