যুক্তরাজ্যের টেমস নদীর তীরে ১৮০ কোটি পাউন্ড ব্যয়ে একটি গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের কাজ পেতে দুবাইয়ের এক শীর্ষ ব্যবসায়ীর পক্ষে তৎকালীন ব্রিটিশ বাণিজ্যমন্ত্রী লর্ড মেন্ডেলসনের কাছে তদবির করেছিলেন কুখ্যাত যৌন নিপীড়ক জেফরি এপস্টেইন। সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগের প্রকাশিত নথিতে এ তথ্য উঠে এসেছে।
ওই ব্যবসায়ীর নাম সুলতান আহমেদ বিন সুলায়েম। তিনি সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইভিত্তিক বন্দর পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ‘ডিপিওয়ার্ল্ড’-এর চেয়ারম্যান। সে সময় তিনি ‘লন্ডন গেটওয়ে’ প্রকল্পের জন্য যুক্তরাজ্য সরকারের কাছ থেকে ঋণের নিশ্চয়তা ও বিনিয়োগ পাওয়ার চেষ্টা করছিলেন।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই ডিপিওয়ার্ল্ডের কাছেই চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। এ সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে চট্টগ্রাম বন্দরের শ্রমিক-কর্মচারীরা কর্মবিরতিসহ নানা কর্মসূচি পালন করছেন।
ডিপিওয়ার্ল্ডের ওয়েবসাইট অনুযায়ী, সুলতান আহমেদ বিন সুলায়েম এখনো প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ জেফরি এপস্টেইনকে ঘিরে ৩০ লাখের বেশি নথি প্রকাশ করে। এসব নথি থেকে জানা যায়, ২০০৯ সালে বিনিয়োগ সহায়তা চেয়ে এপস্টেইন তৎকালীন ব্রিটিশ বাণিজ্যমন্ত্রী লর্ড মেন্ডেলসনের কাছে একটি ই–মেইল পাঠিয়েছিলেন।
২০০৯ সালের মে মাসে বিন সুলায়েমের লেখা এক বার্তায় লন্ডন গেটওয়ে প্রকল্পকে ‘যুক্তরাজ্যের বৃহত্তম অবকাঠামো বিনিয়োগ প্রকল্প (১৮০ কোটি পাউন্ড)’ এবং ‘কর্মসংস্থানের অন্যতম বড় সুযোগ’ হিসেবে তুলে ধরা হয়। ওই প্রকল্পের জন্য তিনি যুক্তরাজ্য সরকারের আর্থিক সহায়তা চেয়েছিলেন।
সে সময় দুবাই সরকারের মালিকানাধীন ডিপিওয়ার্ল্ড এসেক্সে টেমস নদীর তীরে একটি গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করছিল, যাতে কনটেইনারবাহী জাহাজগুলো লন্ডনের আরও কাছাকাছি নোঙর করতে পারে। প্রতিষ্ঠানটির দাবি ছিল, নতুন এই বন্দর ৩৬ হাজার কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে এবং বছরে যুক্তরাজ্যের অর্থনীতিতে ৩২০ কোটি পাউন্ড যোগ করবে।
২০০৯ সালের জুলাই মাসে এপস্টেইনকে পাঠানো আরেকটি ই–মেইলে বিন সুলায়েম লেখেন, যুক্তরাজ্যের অর্থনীতি নিয়ে ব্যাংকগুলোর আশাবাদ কম থাকায় সরকারকে ঋণের নিশ্চয়তা দিতে হবে। একই বছরের নভেম্বরের একটি ই–মেইলে দেখা যায়, লর্ড মেন্ডেলসনের কাছে পাঠানোর আগে একটি বার্তা ‘একটু দেখে দিতে’ এপস্টেইনকে অনুরোধ করেন বিন সুলায়েম। তিনি উল্লেখ করেন, ২০ মিনিটের মধ্যে বার্তাটি ‘পিটার’—অর্থাৎ লর্ড মেন্ডেলসনের কাছে পাঠানো হবে।
ওই ই–মেইলে প্রকল্পটির জন্য সরকারি ঋণের নিশ্চয়তার ওপর জোর দেওয়া হয় এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রধানমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন রশিদ আল-মাকতুমের রাষ্ট্রীয় সফরের আগেই বিষয়টির নিষ্পত্তির গুরুত্ব তুলে ধরা হয়। বিন সুলায়েম সতর্ক করেন, সরকারের সম্মতি ছাড়া প্রকল্পটির ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত।
এপস্টেইন উত্তরে জানান, তিনি ওই বার্তায় কিছু ‘ছোটখাটো সংশোধন’ করেছেন। অন্য একটি ই–মেইল থেকে জানা যায়, ২০০৯ সালের সেপ্টেম্বরে একটি বৈঠক আয়োজনের চেষ্টা চলাকালে এপস্টেইন বিন সুলায়েমকে লর্ড মেন্ডেলসনের ব্যক্তিগত ই–মেইল ঠিকানাও দিয়েছিলেন।
শেষ পর্যন্ত ২০১০ সালের জানুয়ারিতে ডিপিওয়ার্ল্ড নিশ্চিত করে, তারা যুক্তরাজ্যের বন্দর প্রকল্পটি এগিয়ে নেবে। সে সময়ের প্রধানমন্ত্রী গর্ডন ব্রাউন এই বিনিয়োগকে আর্থিক মন্দা কাটিয়ে যুক্তরাজ্যের অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের প্রতি ‘বিরাট আস্থার প্রতীক’ বলে মন্তব্য করেছিলেন।
তবে এসব ই–মেইল আদান-প্রদানের সময় ডিপিওয়ার্ল্ড নিজেই আর্থিক সংকটে ছিল। পরে দুবাই সরকার আর্থিক সহায়তা দিয়ে প্রতিষ্ঠানটিকে উদ্ধার করে।
এপস্টেইনের ই–মেইলগুলোর সর্বশেষ প্রকাশে বিন সুলায়েমসহ বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ীদের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের নানা ব্যক্তিগত তথ্য সামনে এসেছে। জানা যায়, বিন সুলায়েমের সঙ্গে এপস্টেইনের শত শত ই–মেইল আদান-প্রদান হয়েছিল। এর মধ্যে একজন রুশ ‘ম্যাসাজিস্ট’-এর প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা এবং আরও কিছু আপত্তিকর বার্তার কথাও রয়েছে।
জেফরি এপস্টেইনের বিরুদ্ধে অসংখ্য নারী অভিযোগ করেছিলেন যে, তিনি নারী পাচারে জড়িত ছিলেন এবং ক্যারিবীয় সাগরে তাঁর ব্যক্তিগত দ্বীপ ‘লিটল সেন্ট জেমস’-এ তাঁদের যৌনকাজে বাধ্য করতেন। ২০১৯ সালে নিউইয়র্কের একটি কারাগারে তাঁর মৃত্যু হয়। সে সময় তাঁর বিরুদ্ধে যৌনকাজের জন্য নারী পাচারের মামলা চলছিল।
সর্বশেষ এই তথ্য ফাঁসের ঘটনায় লর্ড মেন্ডেলসনের সঙ্গে এপস্টেইনের সম্পর্কের গভীরতাও প্রকাশ পেয়েছে। এসব তথ্য সামনে আসার পর গত রোববার রাতে লর্ড মেন্ডেলসন লেবার পার্টি থেকে পদত্যাগ করেছেন।















