বিলিওনিয়ার হওয়াটা কি আসলেই খারাপ?
৯৯৯ আর ১০০০ এর মধ্যে ডিজিটের হিসাবে পার্থক্যটা বড়ই লাগে দেখতে! একটা তিন ডিজিটের সংখ্যা, আরেকটা ৪ ডিজিটের। আসলে তো পার্থক্য তো ঐ কেবল একেরই! ভারত রাষ্ট্রে বিলিওয়নেয়ার নাকি মাত্র ৩৫৮ জন। মানে ৩৫৮ জন লোকের ১০০ কোটি ডলার বা তার বেশী সম্পদ আছে। এই লিস্টে আম্বানি, আদানি, টাটাদের সাথে লেটেস্ট সংযোজন শাহরুখ খান। শাহরুখ এই কিছুদিন আগ পর্যন্তও ৭৫০ মিলিয়ন ডলার সম্পদের মালিক ছিলেন। এই বছর অফিশিয়ালি তিনি এলিট বিলিওনিয়ার ক্লাবে প্রবেশ করেন।
এটার পেছনে শাহরুখের সিনেমা, প্রোডাকশন কোম্পানি, কেকেআর থেকে শুরু করে পান-মাসালার বিজ্ঞাপনের এন্ডোর্সমেন্টের পয়সারও ভূমিকা আছে। ধ্রুব রাটি সেটা নিয়ে মানে গুটকা/মাসালার বিজ্ঞাপন করা নিয়ে শাহরুখকে একচোট নিয়েছেনও কিছুদিন আগে। সে অন্য আলাপ। পান মাসালা নৈতিকতার মানদন্ডে অনুত্তীর্ণ হলেও আইনী মানদন্ডে উত্তীর্ণ বটে।
সমস্যাটা হলো, শাহরুখের জন্মদিনে প্রকাশিত একটা রিপোর্ট। দেশের প্রথম সারির কয়েকটি মিডিয়াতেই প্রায় একই টেমপ্লেটে এই রিপোর্টটা এসেছে। প্রথম আলোতেও অনূদিত হয়ে ছাপানো হয়েছে রিপোর্টটি। মূলত মিডল ইস্ট আইয়ের আজাদ ইসার প্রতিবেদন এটি। প্রথম আলো রিপোর্ট করেছে ” শাহরুখ খানঃ গণহত্যার সময় বিলিওনিয়ার হওয়ার অর্থ কী” । প্রতিনেদনটি পড়লেই আপনার মনে হতে পারে, সম্ভবত শাহরুখই একমাত্র তারকা যিনি যুদ্ধের সময় বিলিওনিয়ার হয়েছেন। এটাও মনে হতে পারে, চুপ থাকাকেই শাহরুখ তার সম্পদ বানানোর মাধ্যম হিসেবে মেনে নিয়েছেন।
পুরো প্রতিবেদনেই একটা জিনিসই ফোকাস করা হয়েছে, নীরবতা কিভাবে সম্পদশালী বানায়। মজার বিষয় হলো সমসাময়িক অন্য দুই খান নীরব থেকেও বিলিওনিয়ার লিস্টে নাম তুলতে পারেননি।
লেখক ইসা দেখিয়েছেন, কিভাবে নতুন ভারতে শাহরুখের ধনসম্পদ হু হু করে বেড়েছে ; কিন্তু কাশ্মীর, ফিলিস্তিন নিয়ে শাহরুখ মুখ খুলতে চান না! মোটেও ভুল বলেননি। হলিউডের তারকারাও যেভাবে ফিলিস্তিন ইস্যুতে খুল্লামখুল্লা কথা বলেছেন, শাহরুখকে আসলেই ঐসব রূপে মোটেও দেখা যায়নি।
তবে লেখক কিছু বিষয় এড়িয়ে গিয়েছেন, তার জন্যই এই লেখার সূত্রপাত। শাহরুখের মুসলিম পরিচয়টা মাথায় রেখেই লিখা। আজকের ভারতে মুসলমানদের দুর্দশার কথা অজানা নয়। এটাও অজানা নয়, শাহরুখই ভারতের সবচেয়ে প্রভাবশালী মুসলিম। আর রাইট উইং এই বিষয়টা ভালোভাবেই জানে….. আর তাই ২০১০ সাল থেকেই তারা বেশ জোরেশোরে তার পেছনে লাগে! তার মাই নেম ইজ খান সিনেমার রিলিজও অনেক ঝামেলার সৃষ্টি করেছিলো। শো বন্ধ হওয়া, হলের সামনে মব তৈরী করা ; হেন কোন কাজ নেই ভারতের হিন্দুত্ববাদী উইংগুলো করেনি; সেই সময়। ২০১৫ সালেও বিজেপি নেতাদের ব্যাকল্যাশ তাঁকে ফেস করতে হয়েছে। এসবের কারণ, মুসলিমদের দমাতে হলে মুসলিম সমাজের সবচেয়ে পরিচিত ও প্রভাবশালীকে দিয়েই চেষ্টা করতে হবে সেটার। আর কাজও দিয়েছে সেটা। মুসলিম সমাজে একটা বার্তা পৌঁছে যায়, খোদ শাহরুখই এখন নিরাপদ নন, বাকীরা কোন ছার! ২০২১ সালেও সিস্টেম্যাটিক আক্রমণের শিকার হন তার ছেলে। কোন যুতসই অভিযোগ বা প্রমাণ নেই। তাও উদ্দেশ্য একটা, শাহরুখের মোরাল দুর্বল করা।
আজাদ ইসা শাহরুখকে চুপ করে থাকা হিপোক্র্যাট বলতে চেয়েছেন, অথচ তিনি বোধহয় জানেন না,ভারতের মুসলিমদের দমানোর মক টেস্ট ছিলেন এই শাহরুখ খানই! তাকে পাকিস্তান চলে যাও এই ধরনের কটুকথাও শুনতে হয়েছে। শাহরুখ তার সিনেমা জাওয়ানেও বিবিধ বিষয় নিয়ে সরাসরিই সিস্টেমকে প্রশ্ন করেছেন…. যেটা বলিউড সিনেমায় রেয়ার একটা বিষয়।
আজাদ ইসার থিমটা সম্ভবত এরকম যে, শাহরুখ কথা বললেই বোধহয় এসব বিভেদের ইতি ঘটবে। বা ধরে নিলাম ঘটবে না! তবে তিনি যেটা ভুলে গিয়েছেন সেটা হলো এসব সামষ্টিক ঐক্যের জিনিস একজনের ওপর চাপিয়ে দেওয়া যৌক্তিক নয়। ভারত সাংবিধানিকভাবে সেক্যুলার রাষ্ট্র আর শাহরুখও কোন প্র্যাকটিসিং মুসলিম নয়। সেক্যুলার ভারত রাষ্ট্রের জন্য শাহরুখ হয়তো ভালো চরিত্র, কিন্তু যে অর্থে শাহরুখকে প্রশ্নবাণে জর্জরিত হতে হচ্ছে, সেটা একটু সমস্যাজনক। কারণ শিরোনামটা খেয়াল করলেই দেখবেন ” শাহরুখ খানঃ গণহত্যার সৃয় বিলিওনিয়ার হওয়ার অর্থ কী ” এটাতে সমস্যা আছে।
প্রথম সমস্যা হলো, গণহত্যার সময় আপনি ৯৯৯ মিলিয়ন সম্পদের মালিক হতে পারবেন, কিন্তু কোনমতেই ১ বিলিয়ন সম্পদের ক্লাবে ঢোকা যাবে না। শুরুতেই যেটা বললাম ৯৯৯ আর ১০০০ টাকার উদাহরণ টা। অর্থাৎ এই এক বিলিয়নে আসার আগে নিশ্চয়ই শাহরুখ আরো অনেকগুলো ধাপ পার করে এসেছেন, তিনি ৫০০ মিলিয়ন, ৭০০ মিলিয়ন, ৮০০ মিলিয়ন, ৯০০ মিলিয়ন এই ল্যান্ডমার্কগুলোও পার করে এসেছেন। তখনও কোথাও মা কোথাও গণহত্যা হচ্ছিলো ; কিন্তু বিলিওনিয়ার শুনতে শ্রুতিমধুর আর শাহরুখ তখন বিলিওনিয়ার ছিলেন না, তাই তখন এসন নিয়ে লেখা হয়নি! মানে ২১৮ টা ডিম খেয়ে এক যুবকের মৃত্যু টাইপের শিরোনাম, মানে আপনি ২১৭ টা খেলে বেঁচে যেতেন মনে হয়। শাহরুখও ৯৯৯ মিলিয়নে আটকে গেলে ভালো হতো। মরার ১ বিলিয়নই যত আকামের উৎস!
২য় সমস্যা হলো, এর ওয়ান সাইডেড ন্যারেটিভ! শাহরুখ কাশ্মীর, ফিলিস্তিন ইস্যুতে চুপ। তার মানে চুপ থাকাটা অপরাধ। ইসা বুঝাতে চেয়েছেন, শাহরুখের কেবল একটাই অপশন আছে, সেটা হলো চলমান আগ্রাসনের বিরূদ্ধে বলা। শাহরুখ বলেছিলেন বলেই পাকিস্তান চলে যাওয়ার হুমকি পেয়েছিলেন।
আর ইসা যে বিষয়টা উপেক্ষা করে গেছেন, সেটা হলো তার মীর ফাউন্ডেশনের কথা। শাহরুখ বাকী সব জিনিস নিয়ে যতটা উচ্চবাচ্য করেন, কেকেআর বা তার সিনেমা, ঠিক ততোটাই লো প্রোফাইল থাকেন তার চ্যারিটি নিয়ে। তার মীর ফাউন্ডেশন এই মুহুর্তে ভারতের সেলিব্রিটিদের মধ্যে সবচেয়ে অগ্রগণ্য সংস্থা। এসিড ভিক্টিম থেকে শুরু করে বন্যা, দুর্যোগ হেন কোন কাজ নেই মীর ফাউন্ডেশন করে না। এটা ঠিক শাহরুখ দৃষ্টিকটু ভাবে কাশ্মীর বা ফিলিস্তিন ইস্যুতে চুপ থাকেন অথবা অতীত অভিজ্ঞতায় তাকে চুপ থাকতে হয়। কিন্তু শাহরুখ তার মীর ফাউন্ডেশন নিয়েও চুপ থাকেন, এটা ইসা তার লেখায় পয়েন্ট আউট করেননি বা করতে ভুলে গিয়েছেন অথবা ইসার যে উদ্দেশ্য ছিলো লেখাটার, সেটার সাথে এই বিষয়টা হয়তো বেমানান হয়ে যাচ্ছে, ইসার উদ্দেশ্য হয়তো সার্ভ হচ্ছিলো না, মীর ফাউন্ডেশনের কথা তুলে আনলে।
শাহরুখ জাস্ট একজন তারকাই নন, একজন আইকনিক ভয়েস নন, একজন মানুষও। তার নিজের চয়েজের স্বাধীনতা অবশ্যই আছে। শাহরুখ চুপ থাকেন, কারণ শাহরুখ চুপ না থাকার চেষ্টা করে ঝামেলায় পড়েছেন বলে। এসব ঝামেলা শাহরুখের ব্যক্তি ও পরিবারকেও প্রভাবিত করে। মীর ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে এসিড ভিক্টিমদের সহায়তা করা হয়তো তার নীরবতার শোধবোধের একটা উপায়।
শেষ করছি…. “হয়তো”।















