বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের একটি নীতিগত সম্পর্ক রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন কবি ও চিন্তক ফরহাদ মজহার। এই সম্পর্ককে তিনি দেশের জন্য ভয়ংকর অশনিসংকেত হিসেবে দেখছেন বলে জানিয়েছেন।
আজ শুক্রবার দুপুরে জাতীয় প্রেসক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী হলে ‘দেশব্যাপী গ্যাস, বিদ্যুৎ ও বিশুদ্ধ পানির সংকট: সমাজের করণীয়’ শীর্ষক এক সভায় সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেন তিনি।
এক সাংবাদিক যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ওয়াশিংটন পোস্টে প্রকাশিত সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনের প্রসঙ্গ উত্থাপন করেন। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে ‘বন্ধুত্ব’ চায় এবং দলটি যদি বাংলাদেশে শরিয়াহ আইন চালু করতে চায়, সে ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র শতভাগ শুল্ক আরোপ করতে পারে। এ বিষয়ে ফরহাদ মজহারের মতামত জানতে চাইলে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রায় সব রাজনৈতিক দলেরই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ যোগাযোগ রয়েছে।
ফরহাদ মজহার বলেন, ৫ আগস্টের গণ–অভ্যুত্থানের পর যে সাংবিধানিক প্রতিবিপ্লব ঘটেছে, আন্তর্জাতিক পরিসরে সেটিকে যুক্তরাষ্ট্রপন্থী একটি রেজিম চেঞ্জ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। তিনি দাবি করেন, এই বিষয়টি তিনি শুরু থেকেই বলে আসলেও তখন গণমাধ্যমে তেমন গুরুত্ব পায়নি।
তিনি আরও বলেন, শেখ হাসিনাকে সরানো যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কোনো বড় ইস্যু ছিল না এবং তা যুক্তরাষ্ট্রই করবে—এ কথা তিনি গণ–অধিকার পরিষদ ও গণ–অভ্যুত্থানের আগেই বলেছিলেন। তার মতে, বাংলাদেশের সামনে আসল প্রশ্ন হলো, নতুন রাষ্ট্র কাঠামো কীভাবে গড়ে তোলা হবে। কারণ যুক্তরাষ্ট্র একটি ভূরাজনৈতিক শক্তি এবং আন্তর্জাতিক আইন কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়েছে। এই বাস্তবতায় ১৭ কোটি মানুষকে নিয়ে শান্তিপূর্ণভাবে বেঁচে থাকাই তার প্রধান চিন্তা বলে জানান তিনি।
ভারতবিরোধিতা নিয়ে প্রচলিত আলোচনার সমালোচনা করে ফরহাদ মজহার বলেন, ভারতের আধিপত্যের কথা স্বীকার করলেও মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বিষয়ে অনেকেই নীরব থাকেন। তিনি প্রশ্ন তোলেন, কেন যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকাকে একইভাবে আলোচনায় আনা হয় না। গাজায় আন্তর্জাতিক সামরিক উদ্যোগের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, জামায়াত সেখানে আপত্তি তোলে না, যা থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দলটির নীতিগত সম্পর্কের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। এই প্রেক্ষাপটেই যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক বক্তব্যকে তিনি অশনিসংকেত হিসেবে দেখছেন।
সভায় বক্তব্যে ফরহাদ মজহার সেনাবাহিনী ও জনগণের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টির চেষ্টা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, বাংলাদেশের গণ–অভ্যুত্থান ছাত্র-জনতা ও সৈনিকদের পারস্পরিক মৈত্রীর ওপর দাঁড়িয়ে আছে। সেনাসদস্যরা কৃষক ও শ্রমিক পরিবারের সন্তান, তাদের জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা বিপজ্জনক হতে পারে।
গাজা পরিস্থিতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে কোনো আন্তর্জাতিক সামরিক উদ্যোগে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না।
রাষ্ট্র সংস্কার ও নির্বাচন নিয়ে বক্তব্য দিতে গিয়ে ফরহাদ মজহার বলেন, গণ–অভ্যুত্থানের মূল লক্ষ্য ছিল জনগণের জীবনধারণ নিশ্চিত করতে সক্ষম একটি রাষ্ট্র গঠন। কিন্তু সেই লক্ষ্য উপেক্ষিত হয়েছে। লুটপাটতন্ত্র বহাল রেখে নির্বাচন হলে সেই সরকার জনগণের সরকার হবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি। সে কারণেই তিনি আগে রাষ্ট্র গঠনের কথা বলেছিলেন বলে জানান।
গ্যাস, বিদ্যুৎ ও বিশুদ্ধ পানির সংকটকে প্রাকৃতিক নয়, বরং কাঠামোগত ও রাজনৈতিক সংকট হিসেবে উল্লেখ করেন ফরহাদ মজহার। তিনি বলেন, বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়লেও জনগণ বিদ্যুৎ পাচ্ছে না, যা লুটপাটমূলক ব্যবস্থার প্রমাণ। উৎপাদন না করেও বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদনকারীরা রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে অর্থ নিচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
বিশুদ্ধ পানির সংকটের জন্য তিনি রাষ্ট্রীয় অব্যবস্থাপনা, নদী দখল ও বাণিজ্যিক লুণ্ঠনকে দায়ী করেন। তার ভাষায়, জনগণের জীবনধারণের মৌলিক শর্ত—খাদ্য, পানি, জ্বালানি ও জমির ওপর জনগণের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠাই প্রকৃত রাজনীতি। নির্বাচন এখন লুটপাটের ভাগ-বাঁটোয়ারার রাজনীতিতে পরিণত হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
গণ-অভ্যুত্থান সুরক্ষা মঞ্চ নামের একটি সংগঠন এই সভার আয়োজন করে। সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন আহমেদ ফেরদৌস এবং ভাববৈঠকীর সংগঠক মোহাম্মদ রোমেল।
















