ভারতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন সরকারের সময়ে গত এক দশকের বেশি সময় ধরে মুসলিমবিরোধী সহিংসতা ও বিদ্বেষমূলক তৎপরতা বাড়ার অভিযোগ রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে সেই হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদী ঘৃণার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হচ্ছেন খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের মানুষজনও।
ক্রিসমাসের আগের দিন ভারতের শাসক দল বিজেপির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হিন্দু কট্টরপন্থী কয়েকটি সংগঠন ছত্তিশগড়ের রায়পুর শহরে ‘বনধ’-এর ডাক দেয়। তাদের অভিযোগ ছিল, খ্রিস্টানরা ‘জোরপূর্বক ধর্মান্তর’ ঘটাচ্ছে। যদিও এ ধরনের অভিযোগের পক্ষে সুস্পষ্ট প্রমাণ খুব কমই পাওয়া যায়, তবু খ্রিস্টানদের বিরুদ্ধে এ অভিযোগ বারবার তোলা হচ্ছে।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা জানিয়েছে, বনধের দিন লাঠিসোঁটা হাতে একদল লোক রায়পুরের একটি শপিং মলে হামলা চালায়। এ সময় তারা ক্রিসমাস উপলক্ষে করা সাজসজ্জা ভাঙচুর করে এবং উৎসব উদযাপনে বাধা সৃষ্টি করে। ঘটনার পর পুলিশ প্রায় ৪০ জন অজ্ঞাত ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা করলেও গ্রেপ্তার করা হয় মাত্র ছয়জনকে। কয়েক দিনের মধ্যেই তারা জামিনে মুক্তি পায়। মুক্তির পর ওই ব্যক্তিদের ফুলের মালা পরিয়ে মিছিল ও স্লোগানের মাধ্যমে সংবর্ধনা দেওয়ার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
উল্লেখ্য, ক্রিসমাসের দিন (২৫ ডিসেম্বর) প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি দিল্লির একটি ক্যাথলিক গির্জা পরিদর্শন করলেও এসব সহিংস ঘটনার বিষয়ে প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করেননি।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অব অর্গানাইজড হেট-এর প্রকল্প ইন্ডিয়া হেট ল্যাব–এর সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতে ধর্মীয় বিদ্বেষমূলক বক্তব্য ও সহিংসতা ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, মুসলিমদের পাশাপাশি খ্রিস্টানরাও ক্রমশ স্পষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হচ্ছেন।
দ্য গার্ডিয়ান–এর এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, ২০২৫ সালে ভারতে মোট ১ হাজার ৩১৮টি বিদ্বেষমূলক বক্তব্যের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে, যা গড়ে প্রতিদিন তিনটিরও বেশি। ২০২৩ সালের তুলনায় এ সংখ্যা ৯৭ শতাংশ এবং ২০২৪ সালের তুলনায় ১৩ শতাংশ বেড়েছে। খ্রিস্টানদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষমূলক বক্তব্য ২০২৪ সালে যেখানে ছিল ১১৫টি, ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৬২টিতে—যা প্রায় ৪১ শতাংশ বৃদ্ধি।
গত ডিসেম্বরে ক্রিসমাস উদযাপন ঘিরে দিল্লি, মধ্যপ্রদেশ, আসাম, কেরালা, উত্তর প্রদেশ, তেলেঙ্গানা ও ছত্তিশগড়ে হামলা ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের একাধিক ঘটনা ঘটে। মধ্যপ্রদেশে বিজেপির এক নেতা দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য আয়োজিত একটি ক্রিসমাস অনুষ্ঠানে হামলার নেতৃত্ব দেন বলে অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া কেরালায় আরএসএস–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পক্ষ থেকে কিছু স্কুলকে ক্রিসমাস উদযাপন না করার হুমকিও দেওয়া হয়।
ভারতে খ্রিস্টান জনগোষ্ঠীর সংখ্যা মোট জনসংখ্যার মাত্র ২ দশমিক ৩ শতাংশ। অন্যদিকে মুসলিম ১৪ দশমিক ২ শতাংশ এবং হিন্দু প্রায় ৮০ শতাংশ। বিশেষজ্ঞদের মতে, বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর থেকে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে যে ঘৃণার রাজনীতি জোরালো হয়েছে, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো তারই গুরুতর বহিঃপ্রকাশ। তারা সতর্ক করে বলেছেন, এই ধারাবাহিক ঘৃণা ও বিদ্বেষ শেষ পর্যন্ত আরও সহিংসতার দিকে পরিস্থিতিকে ঠেলে দিতে পারে।
















