বার্ষিক চাঁদা বকেয়া থাকাসহ একাধিক সংকটে জাতিসংঘ অত্যাসন্ন আর্থিক ধসের মুখে পড়েছে বলে সতর্ক করেছেন সংস্থাটির মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস। তিনি জানিয়েছেন, পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি না হলে আগামী জুলাইয়ের মধ্যেই জাতিসংঘের নগদ অর্থ ফুরিয়ে যেতে পারে।
চলতি সপ্তাহের শুরুতে জাতিসংঘের সব সদস্যরাষ্ট্রকে পাঠানো গুতেরেসের একটি চিঠি শুক্রবার পর্যালোচনা করেছে আল–জাজিরা। চিঠিতে তিনি বলেন, বিশ্ব সংস্থাটি বর্তমানে একটি ভয়াবহ আর্থিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
গুতেরেস সদস্যরাষ্ট্রগুলোকে জাতিসংঘের আর্থিক বিধিবিধানের মৌলিক সংস্কারে একমত হওয়া, অথবা সংস্থাটির আর্থিক পতনের বাস্তব সম্ভাবনা মেনে নেওয়ার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে তিনি দেশগুলোকে বার্ষিক চাঁদা সময়মতো পরিশোধের অনুরোধ করেন।
এ বিষয়ে শুক্রবার বিকেলে এক সংবাদ সম্মেলনে জাতিসংঘের এক মুখপাত্র বলেন,
“চাঁদা পরিশোধের ক্ষেত্রে এখনই সময়—নইলে আর কখনোই নয়।”
জাতিসংঘের উপমুখপাত্র ফারহান হক বলেন,
“বিগত বছরগুলোতে যেভাবে কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে, তা অব্যাহত রাখার মতো নগদ অর্থ বা তারল্য আমাদের নেই। মহাসচিব প্রতিবছরই ক্রমশ আরও জোরালো ভাষায় এ বিষয়ে সতর্ক করে আসছেন।”
এই সংকট এমন এক সময়ে সামনে এলো, যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন বেশ কয়েকটি জাতিসংঘ সংস্থা থেকে নিজেদের প্রত্যাহারের পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। পাশাপাশি ট্রাম্প সম্প্রতি ‘বোর্ড অব পিস’ নামে একটি নতুন উদ্যোগ চালু করেছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এর উদ্দেশ্য জাতিসংঘকে কোণঠাসা করা।
যদিও গুতেরেস সরাসরি কোনো দেশকে দায়ী করেননি, তবে তাঁর সতর্কবার্তা এসেছে এমন সময়, যখন যুক্তরাষ্ট্র বহুপক্ষীয় সংস্থাগুলোতে অর্থায়ন কমানোর পথে হাঁটছে।
মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)–এর জাতিসংঘবিষয়ক পরিচালক লুই শারবোনো বলেন,
“ট্রাম্পের এই বোর্ড অনেকটা ‘পে-টু-প্লে’ ধরনের একটি বৈশ্বিক ক্লাব বলে মনে হচ্ছে, যেখানে স্থায়ী সদস্য হতে ১০০ কোটি ডলার ফি দিতে হবে।”
তিনি আরও বলেন,
“ট্রাম্পকে ১০০ কোটি ডলারের চেক দেওয়ার বদলে সরকারগুলোর উচিত জাতিসংঘ এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার, মানবিক আইন ও জবাবদিহি রক্ষাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাঁচাতে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করা।”
জাতিসংঘের ওয়েবসাইট অনুযায়ী, ১৯৩টি সদস্যরাষ্ট্রের মধ্যে মাত্র ৩৬টি দেশ এখন পর্যন্ত ২০২৬ সালের নিয়মিত চাঁদা সম্পূর্ণ পরিশোধ করেছে। সদস্যরাষ্ট্রগুলোর চাঁদার হার নির্ধারিত হয় সংশ্লিষ্ট দেশের জিডিপি, ঋণ ও অন্যান্য অর্থনৈতিক সূচকের ভিত্তিতে। জাতিসংঘের মূল বাজেটের ২২ শতাংশ দেয় যুক্তরাষ্ট্র, আর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ দেয় চীন।
গুতেরেস জানান, ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ বকেয়া চাঁদার পরিমাণ রেকর্ড ১৫৭ কোটি ডলারে পৌঁছেছে। তিনি বলেন,
“হয় সব সদস্যরাষ্ট্রকে পূর্ণাঙ্গ ও সময়মতো চাঁদা পরিশোধের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে হবে, নয়তো আসন্ন আর্থিক পতন ঠেকাতে আমাদের আর্থিক কাঠামো আমূল সংস্কার করতে হবে।”
ব্যয় সংকোচনের অংশ হিসেবে চলতি জানুয়ারির শুরুতে জাতিসংঘ ২০২৬ সালের জন্য ৩৪৫ কোটি ডলারের বাজেট অনুমোদন দিয়েছে, যা গত বছরের তুলনায় ৭ শতাংশ কম। তবুও মহাসচিব সতর্ক করেছেন—এই পদক্ষেপ যথেষ্ট নাও হতে পারে।
গুতেরেস চিঠিতে আরও উল্লেখ করেন, একটি সেকেলে নিয়মের কারণে প্রতিবছর অব্যবহৃত কোটি কোটি ডলার সদস্যরাষ্ট্রগুলোকে ফেরত দিতে হয়। তিনি এ ব্যবস্থাকে ‘কাফকায়েস্ক’ (অযৌক্তিক ও জটিল) চক্র হিসেবে বর্ণনা করে বলেন,
“আমরা এমন এক চক্রে আটকে আছি, যেখানে আমাদের কাছে নেই এমন অর্থ ফেরত দেওয়ার আশা করা হয়।”
সব মিলিয়ে, সময়মতো চাঁদা পরিশোধ ও কাঠামোগত সংস্কার না হলে জাতিসংঘের কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।















