ভারত–অধিকৃত জম্মু–কাশ্মীরে মসজিদসংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহে পুলিশের বাড়তি তৎপরতা ঘিরে ব্যাপক ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। মসজিদ নির্মাণ ও পরিচালনার খুঁটিনাটি বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য চাওয়াকে কেন্দ্র করে প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন ধর্মীয় ও রাজনৈতিক বিভিন্ন মহল। স্থানীয়দের মতে, এ ধরনের নজরদারি এই কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে আগে কখনো দেখা যায়নি।
প্রাপ্ত তথ্যে জানা গেছে, পুলিশ কাশ্মীরের বিভিন্ন মসজিদ থেকে নির্মাণকাল, কাঠামোগত বিবরণ, নির্মাণ ব্যয় ও অর্থের উৎস সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করছে। একই সঙ্গে মসজিদ পরিচালনায় বার্ষিক ব্যয় ও আয়ের হিসাবও জানতে চাওয়া হয়েছে। এর বাইরে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পরিচয়, আর্থিক সক্ষমতা, এমনকি পাসপোর্ট, ব্যাংক হিসাব, এটিএম ও ক্রেডিট কার্ডসংক্রান্ত তথ্যও চাওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
পুলিশের এই অতিরিক্ত তৎপরতায় উপত্যকাজুড়ে অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়েছে। প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। সর্বভারতীয় ইংরেজি দৈনিক দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস জানিয়েছে, বিভিন্ন মহলে এই পদক্ষেপের তীব্র সমালোচনা চলছে।
কাশ্মীরের শীর্ষ ধর্মীয় নেতৃবৃন্দের সংগঠন মুত্তাহিদা মজলিস উলেমা (এমএমইউ) পুলিশের এই উদ্যোগকে ‘আক্রমণাত্মক তথ্য সংগ্রহ কর্মসূচি’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। একই সঙ্গে শাসক দল ন্যাশনাল কনফারেন্সের সংসদ সদস্য আগা রুহুল্লাহ মেহেদি অভিযোগ করেছেন, বর্তমানে দেশের শাসনব্যবস্থায় প্রভাবশালী দক্ষিণপন্থী আদর্শ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকেও নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে। তাঁর মতে, এই উদ্যোগের মাধ্যমে ভিন্নমতাবলম্বীদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে।
ধর্মীয় স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের অভিযোগ তুলে আগা রুহুল্লাহ প্রশ্ন তুলেছেন, নিরাপত্তা সংস্থার কাছে প্রয়োজনীয় তথ্য আগে থেকেই থাকলে এই বাড়তি নজরদারির প্রয়োজন কেন। তাঁর আশঙ্কা, এর ফলে সংখ্যালঘু ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে ভীতি ছড়ানো হচ্ছে এবং ভবিষ্যতে ধর্মীয় আচার-অনুশীলনেও হস্তক্ষেপ বাড়তে পারে।
এই উদ্যোগের বিরোধিতা করেছে আওয়ামী ইত্তেহাদ পার্টি (এআইপি)ও। দলটির ব্যানারে গত লোকসভা নির্বাচনে জয়ী সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার রশিদ বর্তমানে কারাবন্দী। দলের প্রধান মুখপাত্র ইনাম উন নবি গণমাধ্যমকে বলেন, পুলিশের চাওয়া তথ্য থেকে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে—ধর্মাচরণকেও নজরদারির আওতায় আনার চেষ্টা চলছে। তিনি বলেন, “এটি প্রশাসনিক ব্যবস্থা বা নিরাপত্তার প্রশ্ন নয়; বরং সাধারণ মানুষকে ভয় দেখানোর একটি প্রচেষ্টা।”
বিভিন্ন সংগঠন অবিলম্বে এই পুলিশি কার্যক্রম বন্ধের দাবি জানিয়েছে। তাদের আশঙ্কা, এ ধরনের উদ্যোগ সামাজিক সম্প্রীতি ক্ষুণ্ন করবে এবং প্রশাসনের প্রতি মানুষের আস্থা নষ্ট করবে।
এমএমইউ নির্বাচিত সরকারের হস্তক্ষেপ কামনা করে উপরাজ্যপাল মনোজ সিনহার কাছে দ্রুত এই পুলিশি উদ্যোগ বন্ধের আহ্বান জানিয়েছে।
এদিকে দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস জানিয়েছে, পুলিশ আনুষ্ঠানিকভাবে এই কার্যক্রমের কথা স্বীকার না করলেও অভ্যন্তরীণ একটি সূত্র জানিয়েছে—কিছুদিন ধরেই এই তথ্য সংগ্রহ চলছে এবং মসজিদ কর্তৃপক্ষকে নির্দিষ্ট ফরম পূরণ করে জমা দিতে বলা হয়েছে।
উল্লেখ্য, জম্মু–কাশ্মীর একটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল। সেখানে নির্বাচিত সরকার থাকলেও পূর্ণ প্রশাসনিক ক্ষমতা তাদের হাতে নেই। বিশেষ করে পুলিশ ও নিরাপত্তাবিষয়ক সিদ্ধান্ত কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন, যা উপরাজ্যপালের মাধ্যমে পরিচালিত হয়।















