ইরানে চলমান অর্থনৈতিক সংকট ও গণবিক্ষোভকে কেবল একটি দেশের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা হিসেবে দেখলে বড় একটি বাস্তবতা আড়াল হয়ে যায়। খামেনি নেতৃত্বাধীন শাসনব্যবস্থা যদি ভেঙে পড়ে বা গভীরভাবে দুর্বল হয়ে যায়, তার প্রভাব শুধু ইরানের সীমান্তে আটকে থাকবে না এটি সরাসরি নাড়িয়ে দেবে ফিলিস্তিন, ইসরায়েল রাজনীতি এবং গোটা মুসলিম বিশ্বের ভূরাজনৈতিক অবস্থান।
চার দশকের বেশি সময় ধরে ইরান নিজেকে দাঁড় করিয়েছে ইসরায়েল ও পশ্চিমা আধিপত্যের বিরুদ্ধে সবচেয়ে আপসহীন শক্তি হিসেবে। হামাস, হিজবুল্লাহসহ বিভিন্ন গোষ্ঠীর প্রতি রাজনৈতিক, আর্থিক ও সামরিক সহায়তার মাধ্যমে তেহরান এমন এক প্রতিরোধী বয়ান তৈরি করেছে, যা মুসলিম বিশ্বের বড় অংশের কাছে তাকে আলাদা মর্যাদা দিয়েছে।
এই বাস্তবতা আজ সংকটে পড়েছে।
ইরান দুর্বল হলে ফিলিস্তিন, ইসরায়েল রাজনীতির নতুন হিসাব
খামেনি সরকারের পতন বা দুর্বলতা মানে ইসরায়েলবিরোধী রাজনীতিতে একটি কাঠামোগত ধাক্কা। কারণ ইরান ছিল শুধু সমর্থক নয় এই রাজনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি।
ইরান দুর্বল হলে
- হামাস ও হিজবুল্লাহের সামরিক ও কৌশলগত সক্ষমতা বড় চাপে পড়বে
- ইসরায়েলের ওপর আঞ্চলিক চাপ কমতে পারে, অন্তত স্বল্পমেয়াদে
- ফিলিস্তিনি রাজনীতি আবার আরব রাষ্ট্র, আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও নিজস্ব অভ্যন্তরীণ পুনর্গঠনের দিকে ফিরে যেতে বাধ্য হবে
এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠছে ফিলিস্তিন প্রশ্ন কি আদর্শিক সংগ্রাম ছিল, নাকি এটি ছিল আঞ্চলিক শক্তি রাজনীতির একটি কার্যকর হাতিয়ার?
মার্কিন হস্তক্ষেপ: বাস্তবতা, কিন্তু একমাত্র ব্যাখ্যা নয়
ইরান সংকট বুঝতে গেলে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা অস্বীকার করা যাবে না। ১৯৫৩ সালে মোসাদ্দেক উৎখাত থেকে শুরু করে আফগানিস্তান, ইরাক, লিবিয়া, মার্কিন রেজিম-চেঞ্জ রাজনীতি বহু দেশের রাষ্ট্রীয় কাঠামো ধ্বংস করেছে।
পাকিস্তান, আফগানিস্তান ও মধ্যপ্রাচ্যের বড় অংশেই মার্কিন সামরিক ও কৌশলগত প্রভাব বাস্তব। ফলে ইরানের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক চাপ, নিষেধাজ্ঞা ও আঞ্চলিক অবস্থানের পেছনে পশ্চিমা স্বার্থ কাজ করছে, এটা অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
তবে এটাও সত্য, এই বাস্তবতা দেখিয়ে কোনো সরকার যদি নিজের জনগণের মৌলিক অধিকার স্থায়ীভাবে স্থগিত করে, তাহলে সে নিজেই নিজের রাজনৈতিক বৈধতা ক্ষয় করে।
কেন মুসলিম বিশ্বে ইরান (এবং তুরস্ক) আলাদা গুরুত্ব পায়
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা স্বীকার করতেই হবে আজকের মুসলিম বিশ্বে ইরান ও তুরস্ক ছাড়া খুব কম দেশই আছে, যারা প্রকাশ্যে চোখে চোখ রেখে পশ্চিমা শক্তির সঙ্গে রাজনৈতিক সংঘাতে দাঁড়াতে প্রস্তুত।
এই বাস্তবতার সবচেয়ে বড় উদাহরণ ফিলিস্তিন নিজেই।
ফিলিস্তিনের পক্ষে মুসলিম বিশ্বের অধিকাংশ রাষ্ট্র কূটনৈতিক বিবৃতি বা মানবিক সহানুভূতির বাইরে যেতে পারেনি। বাস্তব প্রতিরোধ, সামরিক সহায়তা কিংবা কৌশলগত চাপ এসব ক্ষেত্রে ইরানই দীর্ঘদিন কার্যকর ভূমিকা রেখেছে। এই কারণেই বহু মুসলিম সমাজে ইরানকে পশ্চিমা আধিপত্যের বিরুদ্ধে একটি প্রতীক হিসেবে দেখা হয়েছে।
তুরস্কও নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে একই ভূমিকা পালন করেছে যদিও ন্যাটো সদস্য হওয়ায় তাদের অবস্থান বরাবরই দ্বৈত ও হিসাবি।
এই প্রেক্ষাপটে খামেনি সরকারকে পুরোপুরি অস্বীকার করা মানে মুসলিম বিশ্বের রাজনৈতিক দুর্বলতাকেই অস্বীকার করা।
তবু দ্বন্দ্ব থেকে যায়: বাহিরের লড়াই, ভেতরের দমন
সমস্যা শুরু হয় তখনই, যখন পশ্চিমা আধিপত্যের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ভাষা ব্যবহার করে ভেতরের জনগণের কণ্ঠ রোধ করা হয়। ইন্টারনেট বন্ধ, গণগ্রেপ্তার, সহিংস দমন এসব পদক্ষেপ ইরানের প্রতিরোধী অবস্থানকে নৈতিকভাবে দুর্বল করে দেয়।
বাংলাদেশ বা পাকিস্তানের জনগণ এই দ্বৈত বাস্তবতা খুব ভালো করেই বোঝে। তারা জানে একদিকে বিদেশি হস্তক্ষেপ সত্য,
অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ স্বৈরাচারও সমান সত্য।
এই কারণেই আজ মুসলিম বিশ্বে ইরানের প্রতি সমর্থন আর আগের মতো নিঃশর্ত নয়।
খামেনি কেন একসময় মুসলিম বিশ্বের ‘আদর্শ নেতা’ ছিলেন
যখন আরব বিশ্ব নীরব ছিল, যখন ফিলিস্তিন ইস্যু কেবল কূটনৈতিক ফাইল হয়ে পড়েছিল, তখন ইরান সরাসরি সংঘাতের পথে হেঁটেছিল। এই সাহসী অবস্থানই খামেনিকে বহু মুসলিমের চোখে “সেরা নেতা” বানিয়েছিল।
কিন্তু ইতিহাস বলে কোনো নেতৃত্বই চিরকাল বাহিরের শত্রু দেখিয়ে ভেতরের সংকট ঢেকে রাখতে পারে না।
একটি যুগের অবসান, না কি মুসলিম রাজনীতির আত্মসমালোচনা?
খামেনি সরকারের পতন মানেই ফিলিস্তিন ইস্যুর পরাজয় এই ধারণা ভুল। বরং এটি মুসলিম বিশ্বের জন্য একটি কঠিন আত্মসমালোচনার সুযোগ।
প্রশ্ন এখন আর শুধু ইসরায়েল বা আমেরিকা নয়।
প্রশ্ন হলো মুসলিম বিশ্ব কি সত্যিই স্বাধীন রাজনৈতিক শক্তি হতে পেরেছে,
নাকি প্রতিরোধের ভার কয়েকটি দেশের কাঁধে চাপিয়ে দিয়ে বাকিরা নিরাপদ নীরবতায় আশ্রয় নিয়েছে?
এই প্রশ্নের উত্তরই ঠিক করবে খামেনি-পরবর্তী মধ্যপ্রাচ্য কেমন হবে, এবং ফিলিস্তিন ইস্যু ভবিষ্যতে কার এজেন্ডায়, কোন শর্তে টিকে থাকবে।
















