বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বাস্তবতায় সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত শব্দ দু’টি হলো: নৈতিকতা ও সংস্কার। এই দুই শব্দকে সামনে রেখেই ড. মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বাধীন সরকার একটি নৈতিক উচ্চতার প্রতীক হয়ে আবির্ভূত হয়েছিল। বহু মানুষের প্রত্যাশা ছিল দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন, মানবিক রাষ্ট্রব্যবস্থা এবং দায়িত্বশীল শাসন। কিন্তু কয়েক মাস যেতে না যেতেই একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন ক্রমেই বড় হয়ে উঠছে: নৈতিকতা কি রাষ্ট্র চালানোর বিকল্প হতে পারে?
নৈতিকতা আছে, কিন্তু নীতি কোথায়?
রাষ্ট্র পরিচালনা কেবল ভালো মানুষ দিয়ে হয় না, হয় ভালো সিদ্ধান্ত দিয়ে। ইউনুস সরকারের সবচেয়ে বড় সংকট এখানেই নৈতিক উচ্চতা থাকা সত্ত্বেও নীতিগত স্পষ্টতার অভাব। কোন ইস্যুতে সরকার কী অবস্থান নেবে, তা পরিষ্কার নয়। প্রশাসন যেন সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় থাকে, আর সিদ্ধান্ত যেন কারও হাতে নেই।
এই অবস্থাকে বলা যায় administrative paralysis, যেখানে সরকার আছে, কিন্তু শাসন নেই।
‘NGO mindset’ দিয়ে কি রাষ্ট্র চলে?
ড. ইউনুসের দীর্ঘ NGO ও আন্তর্জাতিক দাতা-নির্ভর অভিজ্ঞতা তার ব্যক্তিগত জীবনে সম্মান বয়ে আনলেও রাষ্ট্র পরিচালনায় সেটিই এখন বড় সীমাবদ্ধতা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। NGO-র জগতে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান হয়, সময় নেয়, কনসেনসাস খোঁজা হয়। কিন্তু রাষ্ট্র চলে authority, decisiveness এবং accountability দিয়ে।
বাংলাদেশের মতো জটিল, রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর দেশে “সবাইকে খুশি রাখার” নীতি শেষ পর্যন্ত কাউকেই সন্তুষ্ট করে না বরং রাষ্ট্রকে দুর্বল করে।
অদৃশ্য ক্ষমতা ও দৃশ্যমান দুর্বলতা
আজকের বাংলাদেশে সবচেয়ে বিপজ্জনক প্রশ্নটি হলো কে আসলে দেশ চালাচ্ছে? নির্বাচিত বা ঘোষিত সরকার নাকি প্রশাসনের ভেতরের শক্তি, নাকি আন্তর্জাতিক চাপ, নাকি রাজনৈতিক শূন্যতায় মাথা তোলা অগণতান্ত্রিক শক্তি?
এই অস্পষ্টতা রাষ্ট্রকে পরিণত করছে একটি directionless entity-তে। আর যেখানে দিকনির্দেশনা নেই, সেখানে শক্তিশালী শক্তিরা জায়গা নেয়, এটাই ইতিহাসের নিয়ম।
অবনতি কি দুর্ঘটনা, নাকি সিদ্ধান্ত?
আইনশৃঙ্খলা, অর্থনীতি, কূটনীতি সবখানেই একই চিত্র। অপরাধ দমনে দৃঢ়তা নেই অর্থনীতিতে আস্থার সংকট আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দ্ব্যর্থহীন অবস্থানের অভাব এই অবনতি কি কেবল সময়ের ফল? নাকি সরকার নিজেই সংঘাত এড়াতে গিয়ে দায়িত্ব এড়িয়ে চলছে?
অনেক সময় কিছু না করাই সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত হয়ে ওঠে। ইউনুস সরকারের ক্ষেত্রে এই ‘inaction’ এখন একটি রাজনৈতিক চরিত্রে পরিণত হয়েছে।
নৈতিক নিরপেক্ষতার বিপদ
সরকার যদি বলে “আমরা কারও পক্ষ নিচ্ছি না” তাহলে প্রশ্ন ওঠে, রাষ্ট্র কি কেবল দর্শক? নৈতিক নিরপেক্ষতা তখনই বিপজ্জনক হয়, যখন তা অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান না নেওয়ার অজুহাতে পরিণত হয়।
রাষ্ট্রের দায়িত্ব শুধু ভালো থাকা নয়, ভালো কাজ করা।
ইতিহাস কঠোর বিচারক
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস খুব নির্মম। এখানে দুর্বল সরকারকে কেউ ক্ষমা করে না। নৈতিকতা দিয়ে ইতিহাসে ভালো মানুষ হওয়া যায়, কিন্তু নীতি ও দৃঢ়তা ছাড়া ভালো সরকার হওয়া যায় না।
ড. ইউনুস ব্যক্তিগতভাবে সম্মানিত হতে পারেন, কিন্তু ইতিহাস তাকে বিচার করবে একটি প্রশ্নে তিনি কি রাষ্ট্রকে শক্ত করেছেন, নাকি দুর্বলতার সামনে নীরব থেকেছেন?
শেষ কথা
বাংলাদেশ আজ এমন এক মোড়ে দাঁড়িয়ে, যেখানে অবক্ষয় কোনো দুর্ঘটনা নয় এটি একটি চয়ন (choice)। রাষ্ট্র শক্ত হবে নাকি ভাঙবে, তা নির্ধারিত হবে সাহসী সিদ্ধান্তে, নৈতিক বক্তৃতায় নয়।
নৈতিকতা রাষ্ট্রের অলংকার হতে পারে, কিন্তু রাষ্ট্রের মেরুদণ্ড হলো নীতি ও সিদ্ধান্ত। আর সেই মেরুদণ্ড ভেঙে গেলে রাষ্ট্র দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না, যত ভালো মানুষই শাসন করুক না কেন।















