বিএনপির ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত চট্টগ্রাম–১৬ (বাঁশখালী) আসনে এবার অপ্রত্যাশিত ফল এসেছে। কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়া বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ-এর একক নিয়ন্ত্রণের নির্বাচনগুলো (২০১৪–২০২৪) বাদ দিলে ১৯৯৬, ২০০১ ও ২০০৮ সালের প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনে এ আসনে জয়ী হয়েছিল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। তবে এবার জয় পেয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী-এর প্রার্থী।
স্থানীয় নেতা–কর্মী ও ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিএনপি প্রার্থীর পরাজয়ের পেছনে চারটি কারণ আলোচনায় রয়েছে—সাংগঠনিক দুর্বলতা, শক্তিশালী বিদ্রোহী প্রার্থীকে সামলাতে ব্যর্থতা, ১১ হত্যা মামলার আসামিকে প্রধান সমন্বয়ক করা এবং ত্যাগী নেতাদের দূরে সরিয়ে রাখা।
ফলাফলের চিত্র
জামায়াত প্রার্থী মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম পেয়েছেন ৮৯ হাজার ৯৬০ ভোট। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির মিশকাতুল ইসলাম চৌধুরী পেয়েছেন ৮২ হাজার ২৩৭ ভোট। বিএনপির বিদ্রোহী ও স্বতন্ত্র প্রার্থী লেয়াকত আলী (ফুটবল প্রতীক) পেয়েছেন ৫৫ হাজার ৭১ ভোট।
বাঁশখালীতে জামায়াতের জয় অনেকের কাছেই চমক হিসেবে এসেছে। একই দিনে সাতকানিয়াতেও জামায়াত জয় পেলেও সেখানে ফল অনুমিত ছিল বলে স্থানীয়রা জানান।
সাংগঠনিক দুর্বলতা ও নেতৃত্বের প্রশ্ন
মিশকাতুল ইসলাম চৌধুরী সাবেক মন্ত্রী জাফরুল ইসলাম চৌধুরী-এর ছেলে। অতীতে তাঁর বাবা ১৯৯৬, ২০০১ ও ২০০৮ সালে এ আসনে বিএনপিকে জয় এনে দিয়েছিলেন। তবে এবার অভিযোগ উঠেছে, সাংগঠনিক শক্তির বদলে পারিবারিক পরিচয়ের ওপর নির্ভর করেই নির্বাচনী বৈতরণি পার হওয়ার চেষ্টা হয়েছিল।
দলের ত্যাগী নেতাদের পাশ কাটিয়ে নিজের ঘনিষ্ঠদের দিয়ে প্রচারণা চালানোয় তৃণমূলের একাংশ নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে ভোটসংগ্রহে প্রভাব পড়ে।
বিতর্কিত সমন্বয়ক ও সংখ্যালঘু ভোট
বিএনপির প্রধান নির্বাচনী এজেন্ট করা হয় আমিনুর রহমান চৌধুরী-কে, যিনি বাঁশখালীর সাধনপুরে ২০০৩ সালের ১৯ নভেম্বর সংঘটিত ১১ জন সংখ্যালঘুকে পুড়িয়ে হত্যা মামলার আসামি। মামলাটি বর্তমানে বিচারাধীন। স্থানীয়দের ভাষ্য, তাঁকে প্রধান সমন্বয়ক করায় সংখ্যালঘুসহ সাধারণ ভোটারদের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়।
বিদ্রোহী ফ্যাক্টর
গন্ডামারা ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান লেয়াকত আলী বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। তাঁর প্রাপ্ত ৫৫ হাজার ৭১ ভোটের একটি বড় অংশ বিএনপির ভোটব্যাংক থেকে গেছে বলে দাবি নেতা–কর্মীদের। তাঁদের মতে, এ ভোট দলীয় প্রার্থীর সঙ্গে যুক্ত হলে ফল ভিন্ন হতে পারত।
মিশকাতুলের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে তাঁর প্রধান নির্বাচনী এজেন্ট আমিনুর রহমান বলেন, গন্ডামারা ও শেখেরখীল এলাকায় তাঁরা কাজ করতে পারেননি এবং বিদ্রোহী প্রার্থীর প্রভাব ছিল। তিনি সাংগঠনিক কিছু দুর্বলতার কথাও স্বীকার করেন।
অন্যদিকে বহিষ্কৃত বিএনপি নেতা লেয়াকত আলী বলেন, নিজের জনপ্রিয়তার কারণেই তিনি বিপুল ভোট পেয়েছেন; তাঁকে মনোনয়ন দিলে বিএনপি জয় পেত।
জামায়াতের কৌশল
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে জামায়াত ঘরে ঘরে প্রচারণা চালায়। দলে দৃশ্যমান কোন্দল না থাকা এবং সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান হিসেবে জহিরুল ইসলামের সাংগঠনিক ভিত্তি থাকায় নির্বাচনী কৌশলে তারা এগিয়ে ছিল।
উল্লেখ্য, ২০১৪ সালের উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে জহিরুল ইসলাম ৬৬ হাজার ৩৪২ ভোট পেয়ে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলেন। সেই নির্বাচনে বিএনপি-সমর্থিত প্রার্থীরা সম্মিলিতভাবে উল্লেখযোগ্য ভোট পেলেও বিভক্ত ছিলেন।
সব মিলিয়ে বিশ্লেষকদের মতে, সাংগঠনিক দুর্বলতা ও বিদ্রোহী প্রার্থীর ভোট বিভাজন—এই দুই কারণেই ‘নিশ্চিত’ বলে ধরা বাঁশখালী আসন হাতছাড়া হয়েছে বিএনপির।
















