দেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ‘গ্রহণযোগ্য মাত্রায় সুষ্ঠু’ বলে মনে করলেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক আসনে জাল ভোট পড়ার তথ্য দিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংস্থাটির পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, প্রতি পাঁচটি আসনের মধ্যে একটির বেশি আসনে কারচুপির ঘটনা ঘটেছে।
সোমবার রাজধানীর ধানমন্ডিতে টিআইবির কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে নির্বাচন-পরবর্তী এই বিশ্লেষণ তুলে ধরা হয়। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাব দেন সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান।
টিআইবির করা ৭০টি আসনের তথ্য বিশ্লেষণে চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে এসেছে। বিশ্লেষিত আসনগুলোর মধ্যে ২১ দশমিক ৪ শতাংশ আসনে ‘এক বা একাধিক’ জাল ভোট পড়ার প্রমাণ পাওয়া গেছে। একইসঙ্গে, ১৪ দশমিক ৩ শতাংশ কেন্দ্রে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর এজেন্টদের প্রবেশে বাধা দেওয়ার ঘটনাও ঘটে।
সংবাদ সম্মেলনে টিআইবি আরও জানায়, নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে ১২৫টি। নির্বাচন-পরবর্তী সময়েও এই সহিংসতা অব্যাহত ছিল বলে পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করা হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, নির্বাচন শুরুর দিকে তুলনামূলক সুস্থ প্রতিযোগিতার লক্ষণ দেখা গেলেও ক্রমান্বয়ে পুরোনো রাজনৈতিক চর্চা ফিরে আসে। দল ও জোটের মধ্যে আন্তঃদলীয় কোন্দল, ক্ষমতার জন্য অসুস্থ প্রতিযোগিতা এবং সহিংসতা বৃদ্ধি পায়। পাশাপাশি পতিত কর্তৃত্ববাদী শক্তির ঘোষিত নির্বাচনবিরোধী তৎপরতার ফলে অস্থিতিশীলতা এবং ভোটারদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দেয় বলে পর্যবেক্ষণ টিআইবির।
অর্থ-শক্তির অপব্যবহার প্রসঙ্গে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বলেন, “পূর্বের ন্যায় রাজনৈতিক দল এবং প্রার্থীরা নির্বাচনে অর্থ, ধর্ম ও পেশী ব্যবহার অব্যাহত রেখেছেন। বিশেষ করে অর্থ ও ধর্মের ব্যবহার ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।”
আচরণবিধি লঙ্ঘনে শীর্ষে প্রার্থীরা
টিআইবির তথ্য অনুযায়ী, নির্বাচনে অংশ নেওয়া প্রার্থীদের ৯৯ শতাংশই আচরণবিধির ৫৮টি বিষয়ের মধ্যে কোনও না কোনওটি লঙ্ঘন করেছেন। অনলাইন ও অফলাইন প্রচারণা থেকে শুরু করে নির্বাচনের প্রায় প্রতিটি স্তরে এই লঙ্ঘন দেখা গেছে।
ইফতেখারুজ্জামান স্বীকার করেন, “নির্বাচন কমিশন অনেক চেষ্টা করলেও সক্ষমতার ঘাটতির কারণে অনেক বিষয় নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়নি। ফলে সকল শ্রেণির ভোটারদের জন্য পরিপূর্ণ সম-অধিকারভিত্তিক সুস্থ, নিরপেক্ষ ও নিরাপদ নির্বাচনি পরিবেশ নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।”
‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের প্রমাণ মেলেনি’
নির্বাচনে কারচুপি বা ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং’ হয়েছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “পেছনে কোনও ইঞ্জিনিয়ারিং থাকতে পারে, তবে আমাদের পর্যবেক্ষণে আমরা সরাসরি কোনও ইঞ্জিনিয়ারিং পাইনি। আমাদের বিবেচনায় নির্বাচন তুলনামূলক সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য এবং প্রতিযোগিতামূলক হয়েছে।”
আওয়ামী লীগবিহীন নির্বাচন প্রসঙ্গে
নির্বাচন থেকে আওয়ামী লীগ অনুপস্থিত থাকায় তা ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক ও অংশগ্রহণমূলক’ হয়েছে কি না—এমন প্রশ্ন উঠলে ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “তৃণমূল পর্যায়ে অনেক জায়গায় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা জয় বাংলা স্লোগান দিয়ে ধানের শীষ বা দাঁড়িপাল্লায় ভোট দিতে বলেছেন। তারা ভোট দিয়েছেন। আওয়ামী লীগের শতভাগ নেতাকর্মী ভোট দেননি—এটা বলার সুযোগ নেই।”
তিনি আরও বলেন, আওয়ামী লীগকে বাইরে রেখে এই নির্বাচন ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক’ কি না—এ নিয়ে আরও প্রশ্ন উঠবে বলে তিনি মনে করেন।
প্রতিবেদনে বিএনপির ঋণগ্রস্ত নির্বাচিত প্রার্থীদের প্রসঙ্গ উঠে এলেও টিআইবি স্পষ্ট করে বলে, ঋণগ্রস্ত ও ঋণখেলাপি কিন্তু এক বিষয় নয়। আইন অনুযায়ী তারা ঋণখেলাপি বিবেচিত হন না বলেও জানায় সংস্থাটি।
















