সাম্প্রতিক অস্থিরতা আপাতত শেষ হয়েছে। খেলা আবার মাঠে ফিরেছে, সূচি সচল হয়েছে, সংকট “ম্যানেজ” করা গেছে, এটাই অফিসিয়াল বর্ণনা।
কিন্তু একটি মৌলিক প্রশ্ন থেকে গেছে, যেটা ইচ্ছাকৃতভাবেই এড়িয়ে যাওয়া হচ্ছে, খেলোয়াড়রা যদি নিজেদের অধিকার, সম্মান ও মর্যাদার প্রশ্নে খেলা বয়কট করতে পারে, তাহলে দর্শকরা কেন নিজেদের সম্মান ও অবস্থানের প্রশ্নে বয়কট করতে পারবে না?বয়কট কোনো অপরাধ নয়, এটি একটি অধিকার।
বয়কট মানেই ধ্বংস নয়। বয়কট হলো প্রতিবাদের একটি বৈধ ভাষা। যখন খেলোয়াড়রা খেলা বন্ধ করার ঘোষণা দেয়, তখন সেটাকে বলা হয়
- অধিকার আদায়ের লড়াই
- পেশাদার মর্যাদা রক্ষার পদক্ষেপ
- শক্ত বার্তা দেওয়ার কৌশল
কিন্তু দর্শক যখন বলে “আমরা দেখব না”, “আমরা সমর্থন প্রত্যাহার করব”। তখন সেটাকে বলা হয় আবেগী আচরণ, দায়িত্বজ্ঞানহীনতা, এমনকি ক্রিকেটবিরোধী মনোভাব। এই দ্বিচারিতার মধ্যেই আসল সমস্যা। প্রতিবাদ কি কেবল ক্ষমতাবানদের জন্য? নাকি যাদের হাতে মাঠ, মাইক ও সংগঠন আছে শুধু তারাই বয়কট করতে পারবে? দর্শক কোনো বাইরের মানুষ নয়।
একটি যুক্তি বারবার সামনে আনা হয়েছে । খেলোয়াড়রা দর্শকের বা জনগণের টাকায় বেতন পান না, তারা স্পন্সর ও আইসিসির অর্থে চলে। ধরা যাক, হিসাবের খাতায় এটা ঠিক। কিন্তু বাস্তবতার খাতায় এই যুক্তি অসম্পূর্ণ।
স্পন্সর আসে কেন? টিভি স্বত্বের দাম বাড়ে কীভাবে? আইসিসির রাজস্ব তৈরি হয় কোন শক্তিতে?
উত্তর একটাই, দর্শক।
দর্শক না থাকলে এই পুরো ব্যবস্থার অর্থনৈতিক ভিত্তি ভেঙে পড়ে। দর্শক হয়তো চেক সই করে না, কিন্তু দর্শকই এই খেলাকে অর্থবহ করে তোলে। দর্শকের বয়কট নীরব, কিন্তু ভয়ংকরভাবে কার্যকর দর্শকের বয়কট মানে রাস্তায় নামা নয়। স্লোগান দেওয়া নয়। মিটিং ডাকা নয়। দর্শকের বয়কট হয় নীরবে
- গ্যালারি ফাঁকা থাকে
- টিভির রেটিং নামে
- সোশ্যাল মিডিয়ায় আগ্রহ কমে যায়
- আবেগের সংযোগ ছিন্ন হয়
এটা কোনো ষড়যন্ত্র নয়। এটা সম্মতি প্রত্যাহার। যেভাবে খেলোয়াড় বলতে পারে।
“এই পরিবেশে আমরা খেলব না”
ঠিক সেভাবেই দর্শকও বলতে পারে
“এই আচরণ, এই দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে আমরা নেই”
সম্মান একমুখী হতে পারে না ।সমর্থন কোনো জন্মগত অধিকার নয়। এটা অর্জন করতে হয়।
যদি খেলোয়াড়রা মনে করে পারফরম্যান্স, আচরণ বা বক্তব্য যাই হোক, দর্শককে চুপচাপ পাশে থাকতেই হবে
তাহলে সেটা সম্মান নয়, সেটা বাধ্যবাধকতা।
বাংলাদেশ ক্রিকেট বহু বছর টিকে ছিল সাফল্যের জন্য নয়,
টিকে ছিল দর্শকের অন্ধ আনুগত্যের কারণে।
সেই আনুগত্যকে অবহেলা করা মানে নিজের শিকড় কাটার মতো আত্মঘাতী কাজ।
এটা ক্রিকেটবিরোধী নয়, এটা ভারসাম্যের দাবি
দর্শকের অধিকার নিয়ে কথা বলা মানে খেলোয়াড়বিরোধী হওয়া নয়।
ক্রিকেট টিকে থাকে চারটি শক্তিতে
- খেলোয়াড়ের দক্ষতা
- বোর্ডের কাঠামো
- স্পন্সরের অর্থ
- দর্শকের আবেগ
এই চারটির যেকোনো একটিকে তুচ্ছ করলে পুরো ব্যবস্থাই নড়বড়ে হয়ে যায়।
শেষ প্রশ্নটা এখানেই
প্রশ্নটা আর এই নয় যে খেলোয়াড়দের বয়কটের অধিকার আছে কি না।
আছে, নিঃসন্দেহে।
প্রশ্নটা হলো,
দর্শকের কি একই অধিকার আছে নিজেদের সম্মান, অবস্থান ও মতামত প্রকাশ করার?
যদি উত্তর হয় “না”,
তাহলে ক্রিকেট আর জনগণের খেলা থাকে না। এটা হয়ে যায় একটি বন্ধ সার্কিট। আর ইতিহাস বলে
বন্ধ সার্কিট একদিন না একদিন অন্ধকারেই ডুবে যায়।
লেখক : মোসলেম উদ্দীন
















