জোট রাজনীতিতে ভাঙন মানেই যে উচ্চকণ্ঠ বিদায়, সংবাদ সম্মেলন আর পদত্যাগ, তা নয়। কোনো কোনো ভাঙন ঘটে নিঃশব্দে, কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণার তোয়াক্কা না করেই। জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) বর্তমানে ঠিক সেই নীরব রাজনৈতিক বিচ্ছেদের মধ্য দিয়েই যাচ্ছে।
জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোটের ঘোষণার পর এনসিপির একাংশ প্রকাশ্যে দল ছেড়েছেন। তারা স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, এই জোট তাদের রাজনৈতিক বিশ্বাস ও নৈতিকতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। কিন্তু এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে আরেকটি অংশ, যারা দল ছাড়েননি, অথচ কার্যত দল থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন। প্রকাশ্য ভাঙনের বাইরে এই নীরব অবস্থানই এখন এনসিপির সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক বার্তা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি কোনো আকস্মিক পরিস্থিতি নয়; বরং একটি সচেতন কৌশলগত অবস্থান।
ফরমাল এক্সিট বনাম ইনফরমাল রেজেকশন
দলত্যাগ মানে শুধু পদ ছেড়ে চলে যাওয়া নয়; অনেক সময় তা আদর্শিক প্রতিবাদের ভাষা। যারা এনসিপি ছেড়েছেন, তারা অন্তত তাদের আপত্তির দায় স্বীকার করেছেন। কিন্তু যারা থেকে গেছেন, তারা প্রকাশ্যে কিছু না বলেও কার্যত জানিয়ে দিচ্ছেন, জোটের এই সিদ্ধান্ত তাদের নয়।
রাজনীতির ভাষায় একে বলা হয় ‘ইনফরমাল রিজেকশন’। দলীয় পরিচয় বহাল থাকে, কিন্তু দলীয় সিদ্ধান্তের সঙ্গে মানসিক ও রাজনৈতিক সংযোগ ছিন্ন হয়। এর ফল হিসেবে দেখা যাচ্ছে—দলীয় কর্মসূচিতে অনীহা, ঝুঁকি নিতে অনিচ্ছা এবং কেন্দ্রীয় রাজনৈতিক ভাষা থেকে দূরত্ব।
ভেতরের ভয়: দলীয় পরিচয় এখন বোঝা
এক সময় রাজনৈতিক দলের পরিচয় ছিল শক্তির উৎস। কিন্তু জামায়াতের সঙ্গে জোটের পর এনসিপির সেই পরিচয় অনেকের কাছে হয়ে উঠেছে বোঝা। এই বাস্তবতা অস্বীকার করছেন না দলটির নেতারাও।
ফলে মাঠপর্যায়ে একটি স্পষ্ট মানসিকতা তৈরি হয়েছে, দল সামনে থাকলে ক্ষতি, ব্যক্তি সামনে থাকলে টিকে থাকা সহজ। এর ফলেই দেখা যাচ্ছে দলীয় ব্যানারের বদলে ব্যক্তিকেন্দ্রিক প্রচারণা।
নমিনেশনপ্রাপ্তদের প্রচারণা: Collective Politics-এর মৃত্যু
নির্বাচন সাধারণত কোনো দলের ঐক্য ও শক্তির সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। কিন্তু এনসিপির মনোনয়নপ্রাপ্ত প্রার্থীদের প্রচারণায় সেই সম্মিলিত রাজনীতির চিহ্ন প্রায় অনুপস্থিত।
কেউ নিজের নামেই প্রচারণা চালাচ্ছেন, কেউ সচেতনভাবে দলীয় পরিচয় আড়াল করছেন, আবার কেউ কেবল আইনি বা প্রশাসনিক লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ। দলীয় মিছিল, কেন্দ্রীয় বার্তা বা সমন্বিত কৌশল; কোনোটিই দৃশ্যমান নয়।
এই চিত্র স্পষ্ট করে দিচ্ছে, এনসিপি আর একটি সমষ্টিগত রাজনৈতিক শক্তি (collective political force) হিসেবে কাজ করছে না; বরং এটি হয়ে উঠছে বিচ্ছিন্ন ব্যক্তিগত প্রচারণার (parallel individual campaigns) একটি ঢিলা কাঠামো।
হাসনাতের একাকী লড়াই: সারজিসের অন্যরকম নিরবতা
দলটির ভেতরের সংকট সবচেয়ে স্পষ্টভাবে ধরা পড়েছে দুটি ঘটনায়। একদিকে হাসনাত—যিনি প্রতিদ্বন্দ্বীর মনোনয়ন বাতিলের বিরুদ্ধে কার্যত একাই আইনি লড়াই চালাচ্ছেন। এখানে দলীয় উপস্থিতি প্রায় নেই। বিশ্লেষকদের মতে, এটি কেবল সাংগঠনিক দুর্বলতা নয়; বরং সচেতন রাজনৈতিক আত্মরক্ষা। দলকে সামনে আনলে নিজের অবস্থান দুর্বল হতে পারে, এই হিসাব থেকেই তিনি ব্যক্তিগত ও আইনি পথ বেছে নিয়েছেন।
অন্যদিকে সারজিসের প্রায় সম্পূর্ণ নীরবতা। রাজনৈতিক মহলে এটিকে ‘স্ট্র্যাটেজিক ওয়েটিং’ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ভবিষ্যৎ পুনর্বিন্যাসে সুবিধাজনক অবস্থান নেওয়ার আশায় এখন কোনো অবস্থান না নেওয়াই তার কৌশল। কিন্তু এই নীরবতাও দলকে আরও ফাঁকা করে দিচ্ছে।
মূল সংকট: সিদ্ধান্তের দায় কার?
এনসিপির বর্তমান অবস্থার কেন্দ্রে রয়েছে একটি বিষয়,জোট সিদ্ধান্তের মালিকানা সংকট। জামায়াতের সঙ্গে জোট ছিল স্পষ্টতই উপর থেকে চাপানো সিদ্ধান্ত। মাঠপর্যায়ের নেতা-কর্মী বা মধ্যম সারির নেতৃত্ব এই সিদ্ধান্তে নিজেদের প্রতিফলন খুঁজে পাননি।
ফলে তাদের মনে একটি প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে সিদ্ধান্ত যদি আমার না হয়, দায় কেন আমি নেব?
রাজনীতিতে এই মনোভাবই সবচেয়ে বিপজ্জনক। কারণ এখান থেকেই দল ভাঙে, ঘোষণায় নয়, বাস্তবে।
দল আছে, কিন্তু দলীয় রাজনীতি নেই
আজ এনসিপির দিকে তাকালে দেখা যায়-
কাগজে দল আছে,
নির্বাচন কমিশনের তালিকায় দল আছে,
ব্যালটে প্রতীক আছে।
কিন্তু বাস্তবে নেই সম্মিলিত লড়াই, নেই যৌথ স্বপ্ন, নেই রাজনৈতিক আত্মত্যাগ। এনসিপি ক্রমেই পরিণত হচ্ছে একটি অস্থায়ী রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মে, যেখানে প্রত্যেকে নিজের সুবিধামতো অবস্থান নিচ্ছেন।
রাজনৈতিক ইতিহাস বলছে, এই ধরনের অবস্থা দীর্ঘস্থায়ী হয় না। নির্বাচনের পর সাধারণত এমন দলগুলো বড় ভাঙনের মুখে পড়ে; কেউ নতুন জোটে যায়, কেউ রাজনীতি ছাড়ে, কেউ নতুন পরিচয়ে ফিরে আসে।
এনসিপির ক্ষেত্রেও ভিন্ন কিছু হওয়ার লক্ষণ নেই। সমস্যা এখন আর শুধু জামায়াত জোট নয়; সমস্যা হলো, এই সিদ্ধান্ত দলটিকে একসঙ্গে রাখার ক্ষমতাই কেড়ে নিয়েছে।
আর তাই রাজনৈতিক অঙ্গনে এখন একটি কথাই ঘুরছে-
এনসিপি ভাঙেনি, কিন্তু তার দলীয় রাজনীতি ভেঙে পড়েছে।
















