রয়টার্স
বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক বাস্তবতায় এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, বিশ্বের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো কোনো দেশের জাতীয় নির্বাচনের ফল নির্ধারণে সবচেয়ে প্রভাবশালী শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হতে যাচ্ছে জেনারেশন জেড (জেন–জি)। আর সেই দেশটি হলো বাংলাদেশ।
রয়টার্স জানায়, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শাসনামলে দীর্ঘদিন ধরে নির্বাচনী রাজনীতিতে বিরোধী দলগুলোর কার্যকর উপস্থিতি ছিল না। বিএনপিসহ বিরোধী দলগুলো কখনো নির্বাচন বর্জন করেছে, আবার কখনো শীর্ষ নেতাদের গ্রেপ্তার ও দমন-পীড়নের কারণে মাঠের বাইরে ছিল। তবে আসন্ন ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন সেই বাস্তবতাকে ভেঙে দিয়েছে।
গণঅভ্যুত্থানের সময় সহিংস দমন-পীড়নের দায়ে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম বর্তমানে নিষিদ্ধ। ২০২৪ সালের আন্দোলনে সামনে থেকে নেতৃত্ব দেওয়া অনেক তরুণ ভোটার রয়টার্সকে বলেছেন, ২০০৮ সালের পর এটিই বাংলাদেশের প্রথম সত্যিকারের প্রতিযোগিতামূলক জাতীয় নির্বাচন। ওই নির্বাচনেই শেখ হাসিনার টানা ১৫ বছরের শাসনের সূচনা হয়েছিল।
এই নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) জয়ী হওয়ার সবচেয়ে বড় দাবিদার হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। পাশাপাশি জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটও শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে। এর পাশাপাশি ৩০ বছরের নিচে জেন–জি তরুণদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা একটি নতুন রাজনৈতিক শক্তি আলোচনায় এসেছে। শেখ হাসিনাবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রাখলেও শক্ত সাংগঠনিক ভিত্তি গড়তে না পারায় তারা শেষ পর্যন্ত জামায়াতের সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়েছে।
সম্প্রতি রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেন, তার দল ৩০০ আসনের মধ্যে ২৯২টিতে প্রার্থী দিয়েছে এবং সরকার গঠনের মতো আসন পাবে বলে তারা আশাবাদী।
বিশ্লেষকদের মতে, ১২ ফেব্রুয়ারির ভোটে যদি একটি পরিষ্কার ও নির্ধারক ফল আসে, তাহলে প্রায় সাড়ে ১৭ কোটি মানুষের দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরতে পারে। শেখ হাসিনার পতনের পর কয়েক মাস ধরে চলমান অস্থিরতার প্রভাব পড়েছে তৈরি পোশাকসহ বড় শিল্প খাতে। বাংলাদেশ বর্তমানে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক দেশ। এই নির্বাচনের ফল দক্ষিণ এশিয়ায় চীন ও ভারতের কৌশলগত অবস্থানকেও প্রভাবিত করবে বলে মনে করা হচ্ছে।
ঢাকার সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজের (সিজিএস) নির্বাহী পরিচালক পারভেজ করিম আব্বাসী রয়টার্সকে বলেন, জনমত জরিপে বিএনপি এগিয়ে থাকলেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ভোটার এখনো সিদ্ধান্তহীন। তার মতে, নির্বাচনের ফলাফলে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখতে পারে জেন–জি ভোটাররা, যারা মোট ভোটারের প্রায় এক-চতুর্থাংশ।
রয়টার্স জানায়, রাজধানীসহ সারা দেশে বিএনপির ‘ধানের শীষ’ ও জামায়াতের ‘দাঁড়িপাল্লা’ প্রতীকের পোস্টার-ব্যানারে ভরে গেছে দেয়াল, গাছ ও খুঁটি। স্বতন্ত্র প্রার্থীদের পোস্টারও চোখে পড়ছে। মোড়ে মোড়ে অস্থায়ী কার্যালয় থেকে প্রচারণার গান বাজছে—যা গত দেড় দশকের নির্বাচনী পরিবেশ থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন।
আগের নির্বাচনে যেখানে সর্বত্র আওয়ামী লীগের ‘নৌকা’ প্রতীকই প্রাধান্য পেত, এবার সেই চিত্র নেই। জনমত জরিপগুলো বলছে, সরকার গঠন করতে না পারলেও একসময় নিষিদ্ধ থাকা জামায়াতে ইসলামী এবারের নির্বাচনে তাদের ইতিহাসের সেরা ফল করতে পারে।
আঞ্চলিক ভূরাজনীতির দিক থেকেও নির্বাচনটি গুরুত্বপূর্ণ। শেখ হাসিনাকে দীর্ঘদিন ভারতঘেঁষা নেতা হিসেবে দেখা হতো। ক্ষমতা হারানোর পর তিনি ভারতে আশ্রয় নিয়েছেন, যা বাংলাদেশে ভারতের প্রভাব কমে যাওয়া এবং চীনের প্রভাব বাড়ার ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকেরা। তাদের মতে, বিএনপি ভারতের সঙ্গে তুলনামূলকভাবে বেশি সমন্বয়মূলক সম্পর্ক রাখতে পারে, আর জামায়াত নেতৃত্বাধীন সরকার হলে পাকিস্তানের দিকে ঝোঁক বাড়তে পারে।
তবে জামায়াত বলছে, তারা কোনো নির্দিষ্ট দেশের পক্ষ নেবে না; বরং ইসলামী নীতির আলোকে রাষ্ট্র পরিচালনা করতে চায়। তাদের জেন–জি মিত্র দলটি ‘নতুন দিল্লির আধিপত্য’ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এবং সম্প্রতি চীনা কূটনীতিকদের সঙ্গেও বৈঠক করেছে।
তারেক রহমান রয়টার্সকে বলেন, বিএনপি সরকার গঠন করলে যেসব দেশ বাংলাদেশের জনগণ ও জাতীয় স্বার্থে উপযোগী প্রস্তাব দেবে, তাদের সঙ্গেই বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলা হবে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংকট ও বিনিয়োগ স্থবিরতার কারণে বাংলাদেশ ইতোমধ্যে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর কাছ থেকে বিলিয়ন ডলার ঋণ নিয়েছে।
ঢাকাভিত্তিক গবেষণা সংস্থা কমিউনিকেশন অ্যান্ড রিসার্চ ফাউন্ডেশন এবং বাংলাদেশ ইলেকশন অ্যান্ড পাবলিক ওপিনিয়ন স্টাডিজের জরিপে দেখা গেছে, ১২ কোটি ৮০ লাখ ভোটারের প্রধান উদ্বেগ দুর্নীতি ও মূল্যস্ফীতি। বিশ্লেষকদের মতে, জামায়াতের প্রতি ভোটারদের আগ্রহের বড় কারণ তাদের ‘পরিচ্ছন্ন’ ভাবমূর্তি, যা ধর্মীয় আদর্শের চেয়েও বেশি প্রভাব ফেলছে।
সব মিলিয়ে বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, খালেদা জিয়ার ছেলে তারেক রহমানই পরবর্তী সরকারপ্রধান হওয়ার দৌড়ে এগিয়ে আছেন। তবে জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট এগিয়ে গেলে তাদের আমির ডা. শফিকুর রহমানও শীর্ষ নেতৃত্বে আসতে পারেন।
এদিকে ২১ বছর বয়সী প্রথমবারের ভোটার মোহাম্মদ রাকিব রয়টার্সকে বলেন, তিনি চান আগামী সরকার মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও অবাধ ভোটাধিকার নিশ্চিত করুক। তার ভাষায়, “মানুষ শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। আমরা ভোট দিতে পারিনি, কথা বলার সুযোগ পাইনি। এবার যে দলই আসুক, তারা যেন আমাদের কণ্ঠস্বর ফিরিয়ে দেয়।”
















