লেখকঃ আশরাফুল ওসমান সাব্বির
শবে বরাত, সুনান ইবনে মাজাহ্ শরীফের ১৩৯০ নং হাদীসে বর্ণিত এই লাইলাতুন নিসফ মিনাশ শা’বান ধর্মীয় রিচুয়ালের বাইরে গিয়েও যে বাঙ্গালী সংস্কৃতির বিশাল একটি সৌন্দর্যের দিক বহন করে, তা অনেকেই গ্রহণ করতে চান না কিংবা এড়িয়ে যান। অথচ গ্রহণ করতে না চাওয়া মানুষগুলোর মধ্যে অনেককেই আমি মঙ্গল শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণ করতে দেখেছি বাঙালি সংস্কৃতির অংশ হিসেবে বিশ্বাস করে।
শবে বরাতে রুটি হালুয়া বিতরণের সংস্কৃতি বেশ পুরনো এবং এটি মূলত ধর্মীয় রিচুয়ালের চেয়েও সামাজিক ও ঐতিহ্যগত বিবর্তনের ফল। ঐতিহাসিকদের মতে, ভারতীয় উপমহাদেশে হালুয়া-রুটির প্রচলন মূলত পারস্য (বর্তমান ইরান) এবং মধ্য এশিয়া থেকে আসা মুসলিমদের মাধ্যমে শুরু হয়। মুঘল আমলে রাজকীয় রান্নাঘরে বিভিন্ন ধরনের হালুয়া তৈরির ব্যাপক চল ছিল, যা পরবর্তীতে সাধারণ মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। আর ধর্মীয় রিচুয়ালগুলো পালনের সময় মসজিদের দিকে যাতে এলাকার মানুষজন ছোট বাচ্চাদের আকৃষ্ট করা যায়, সেজন্যেই এই চলনের শুরু হয়েছিলো বলে ধারণা করা হয়।
ব্রিটিশ আমলের সিভিল সার্জন জেমস ওয়াইজের পূর্ববঙ্গের মুসলমানদের জীবনযাত্রা নিয়ে লেখা Notes on the Races, Castes and Trades of Eastern Bengal (১৮৮৩) বইয়ের ৩৬ পৃষ্ঠায় তিনি উনবিংশ শতাব্দীতে শবে বরাতের সময় মুসলমানদের মিষ্টিজাতীয় দ্রব্য এবং রুটি বিতরণের অভ্যাসের কথা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছেন, “The Shab-i-barat is a night of rejoicing. It is celebrated by a display of fireworks and by the distribution of halwa (a sweetmeat) and bread among the poor, as well as by sending portions to friends and relations.”অর্থাৎ, ”শবে বরাত হলো আনন্দের একটি রাত। আতশবাজি প্রদর্শন এবং দরিদ্রদের মাঝে হালুয়া (এক প্রকার মিষ্টি) ও রুটি বিতরণের মাধ্যমে এটি উদযাপন করা হয়; সেইসাথে বন্ধু-বান্ধব ও আত্মীয়-স্বজনদের কাছেও এর (খাবারের) অংশ পাঠানো হয়।”
প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য আবদুল করিম স্যার তাঁর PhD গবেষণা “Social History of the Muslims in Bengal” এর ১৬৪ পৃষ্ঠায় লিখেছেন, ”বাংলার মুসলিম সমাজে শবে বরাত ছিল অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি উৎসব। সুলতানি ও মুঘল আমলে এই রাতে আলোকসজ্জা ও তবারক বিতরণের যে রাজকীয় প্রথা ছিল, তা পরবর্তী সময়ে সাধারণ মানুষের ঘরে ঘরে হালুয়া ও রুটি তৈরির সংস্কৃতিতে রূপ নেয়। মূলত পারস্য সংস্কৃতির প্রভাবে এবং স্থানীয় আপ্যায়নের রীতির সংমিশ্রণে এটি একটি সামাজিক আচারে পরিণত হয়।”
ইতিহাসবিদ ও সাহিত্যিক সৈয়দ মুর্তজা আলী তাঁর বিখ্যাত আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ ‘আমাদের কালের কথা’ (প্রকাশকাল: ১৯৬৮) স্মৃতিচারণমূলক লেখায় উল্লেখ করেছেন যে, শবে বরাতে মসজিদের বারান্দায় সারি বেঁধে শিশুদের বসে থাকার প্রধান কারণ ছিল সিন্নি বা মিষ্টির প্রতীক্ষা। এটি তাদের জন্য একটি বড় ‘ইনসেনটিভ’ হিসেবে কাজ করতো।
ঢাকার ইতিহাসবিদ মুনতাসীর মামুন তাঁর বই “ঢাকা: স্মৃতি বিস্মৃতির নগরী” -এ শবে বরাতের অধ্যায়ে পুরান ঢাকার বাসিন্দাদের লোকজ বিশ্বাসের কথা উল্লেখ করে বলেছেন, সেসময় ঢাকার মহল্লাগুলোতে বাচ্চাদের মিষ্টির হাড়ি বা হালুয়া দিয়ে মসজিদে পাঠানো হতো। বয়োজ্যেষ্ঠদের বিশ্বাস ছিল, বাচ্চারা যখন হাসিমুখে মিষ্টি খায় বা মসজিদে ছোটাছুটি করে, তখন মহান আল্লাহ খুশি হন এবং সেই ঘরে রহমত নাজিল হয়। এটি একটি শক্তিশালী সামাজিক বিশ্বাস ছিল যা আজও অনেক পরিবারে প্রচলিত।
এসব জিনিস নিয়ে প্রমাণ খোঁজা আসলে হাস্যকর। এরকম অসংখ্য তথ্য পাবেন বাঙ্গালীদের ইতিহাসের বিভিন্ন বইয়ে। এসব সৌন্দর্য। ধর্মীয় রিচুয়ালের বাইরের সৌন্দর্য। এগুলো আমাদের বাচ্চাদেরকে মসজিদমুখী করবে। এবং এগুলোর মাধ্যমে তারা ধর্মের দিকে প্রভাবিত হবে, যে এই ধর্ম মানুষকে বেঁধে রাখে না আনন্দ করাও শেখায়।
এসব দেখার পরেও যদি আপনার কিতাবে হালুয়া রুটির দলীল খোঁজা লাগে তাহলে আসলে আপনাকে ঐ পাকস্তানি আলেমের কথাগুলো বলতেই হয়,
“শবে বারাত ম্যায় হালুয়া বানায়ে হাম, কিতাব ম্যায় খোঁজে ওয়হ!
হালুয়া কৌন কিতাব ম্যা হ্যায়?? হাম বোলে, হালুয়া কিতাব ম্যায় নেহী, হালুয়া কাড়াহি ডেকসি ম্যায় রেহতা হ্যায়! ওয়হ বোলে, হামলোগ কিতাব ম্যায় হালুয়া খোঁজতে খোঁজতে থাক গায়ী, হাম বোলে, হামলোগ কাড়াহী সে নিকালকে খাতে খাতে খাতে থাক গায়ী।
তুম লোগ খোঁজতে রাহো, হাম লোগ খাতে রাহে”















