বাণিজ্য ডেস্ক
প্রকাশ: ১১ জানুয়ারি ২০২৬, ১৬:৫২
পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে জ্বালানি তেলের বিকল্প উৎস খুঁজছে ভারত। এ প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের অনুমোদন নিয়ে আবারও ভেনেজুয়েলার কাছ থেকে অপরিশোধিত তেল কেনার উদ্যোগ নিয়েছে ভারতের শীর্ষ শিল্পগোষ্ঠী রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজ। বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, মার্কিন নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা ভেনেজুয়েলার তেল আমদানির ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় ছাড় পেতে ওয়াশিংটনের সঙ্গে যোগাযোগ চালাচ্ছে রিলায়েন্স।
বিষয়টি সম্পর্কে অবগত দুটি সূত্র গত শুক্রবার রয়টার্সকে জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের অনুমোদন পেলে রিলায়েন্স ভেনেজুয়েলা থেকে অপরিশোধিত তেল কেনার প্রস্তুতি নেবে। রাশিয়া থেকে তেল কেনা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান চাপের মুখে পড়েই এই বিকল্প পথ খুঁজছে ভারত। সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, ভারত যদি রাশিয়া থেকে তেল কেনা বন্ধ না করে, তবে দেশটির ওপর ৫০০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হবে।
সূত্রগুলো জানায়, অনুমোদন আদায়ের লক্ষ্যে রিলায়েন্সের প্রতিনিধিরা যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। ৩ জানুয়ারি ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরো যুক্তরাষ্ট্রের হাতে আটক হওয়ার পর পাঁচ কোটি ব্যারেল তেল সরবরাহ নিয়ে ওয়াশিংটন ও কারাকাসের মধ্যে যে আলোচনা চলছে, তার মধ্যেই ভারতের এই তৎপরতা এগোচ্ছে।
গত বছরের শুরুতে দ্বিতীয় দফায় ক্ষমতায় আসার পর থেকেই বৈশ্বিক জ্বালানি বাণিজ্যে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। রাশিয়া থেকে তেল কেনা নিয়ে ভারত, চীন ও ব্রাজিলের মতো দেশগুলোর ওপর তিনি একাধিকবার চাপ সৃষ্টি করেছেন। যদিও ক্ষমতায় এসে রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধ দ্রুত থামানোর অঙ্গীকার করেছিলেন ট্রাম্প, বাস্তবে সে উদ্যোগ সফল হয়নি। বরং রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের কৌশলগত অবস্থানের কারণে যুদ্ধবিরতির আলোচনা এগোলেও তা মূলত রুশ শর্তের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে রাশিয়ার দীর্ঘদিনের মিত্র ভারতের ওপর চাপ বাড়ানোর কৌশল নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। যদিও ওয়াশিংটন নিজে রাশিয়া থেকে ইউরেনিয়াম আমদানি অব্যাহত রেখেছে, তবু রাশিয়ার তেল কেনার জন্য ভারতের বিরুদ্ধে ৫০০ শতাংশ শুল্ক আরোপের বিল পেশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে ভারতের সামনে ভেনেজুয়েলার তেলকে সম্ভাব্য বিকল্প হিসেবে সামনে এনেছে ট্রাম্প প্রশাসন।
ভারতের সংবাদ সংস্থা আইএএনএসের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, হোয়াইট হাউস জানিয়েছে—একটি নতুন ব্যবস্থার আওতায় ভারতকে ভেনেজুয়েলা থেকে তেল কেনার অনুমতি দেওয়া হতে পারে। তবে এই ব্যবস্থার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ থাকবে মার্কিন প্রশাসনের হাতে। মার্কিন প্রশাসনের এক শীর্ষ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, অনুমতি দেওয়ার বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত হলেও শর্তাবলি এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
একসময় ভেনেজুয়েলার অন্যতম বড় তেল ক্রেতা ছিল ভারত। তবে দক্ষিণ আমেরিকার দেশটির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপের পর সেখান থেকে তেল আমদানি বন্ধ করে দেয় নয়াদিল্লি। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজ নিয়মকানুন মেনে ভেনেজুয়েলার তেল কেনার বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, হোয়াইট হাউস যদি ভেনেজুয়েলার অপরিশোধিত তেল বিশ্ববাজারে বিক্রির অনুমতি দেয়, তাহলে তারা চুক্তি নিয়ে ভাববে।
ভেনেজুয়েলার তেল ভারতের জন্য রাশিয়ার তেলের আংশিক বিকল্প হতে পারে। একসময় রাশিয়ার তেলের সবচেয়ে বড় ভারতীয় ক্রেতা ছিল রিলায়েন্স। তবে ট্রাম্প প্রশাসনের চাপের মুখে এ মাসে রাশিয়া থেকে কোনো অপরিশোধিত তেলের চালান না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
গুজরাটের পশ্চিমাঞ্চলে রিলায়েন্সের দুটি বড় তেল পরিশোধনাগার রয়েছে, যেগুলোর সম্মিলিত পরিশোধন সক্ষমতা দৈনিক প্রায় ১৪ লাখ ব্যারেল। রয়টার্স জানিয়েছে, ভেনেজুয়েলার মেরেইয়ের মতো ভারী ও তুলনামূলক সস্তা অপরিশোধিত তেল এসব পরিশোধনাগারে সহজেই প্রক্রিয়াজাত করা সম্ভব।
রিলায়েন্স ও ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি পিডিভিএসএর মধ্যে দীর্ঘদিনের বাণিজ্যিক সম্পর্ক রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার আগে ভেনেজুয়েলার অপরিশোধিত তেলের তৃতীয় বৃহত্তম বাজার ছিল ভারত, যেখানে দৈনিক প্রায় চার লাখ ব্যারেল তেল আমদানি করা হতো। কয়েক বছর আগে যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ অনুমোদনে সীমিত পরিসরে আবারও ভেনেজুয়েলার তেল আমদানি করেছিল রিলায়েন্স।
পিডিভিএসএর অভ্যন্তরীণ নথি অনুযায়ী, ওই অনুমোদনের আওতায় ২০২৫ সালের প্রথম চার মাসে চার দফায় রিলায়েন্সকে দৈনিক গড়ে প্রায় ৬৩ হাজার ব্যারেল অপরিশোধিত তেল সরবরাহ করা হয়। তবে মার্চ ও এপ্রিল মাসে যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার বিভিন্ন বাণিজ্যিক অংশীদারকে দেওয়া অধিকাংশ লাইসেন্স স্থগিত করে এবং মাদুরো সরকারের ওপর চাপ বাড়াতে তেল ক্রেতাদের বিরুদ্ধে শুল্ক আরোপের হুমকি দেয়।
















