ঈদুল ফিতর আসতে এখনো কয়েক সপ্তাহ বাকি। কিন্তু রাজধানীর বিভিন্ন মার্কেট ও অনলাইন শপিং প্ল্যাটফর্মে ইতিমধ্যে কেনাকাটার ধুম পড়ে গেছে। আর এবারের ঈদ বাজারে চোখে পড়ার মতো একটি বিষয় হলো পাকিস্তানি পোশাকের ব্যাপক উপস্থিতি। শুধু রাজধানীর নিউ মার্কেট, বসুন্ধরা সিটি কিংবা গুলশানের ফ্যাশন হাউসগুলোই নয়, ফেসবুক ও ইন্সটাগ্রামের অসংখ্য পেজও এখন সাজানো পাকিস্তানি লন, শিফন আর ক্রেপ কাপড়ের নানা ডিজাইনের পোশাকে। প্রশ্ন হচ্ছে, হঠাৎ করে পাকিস্তানি পোশাকের এই চাহিদা বাড়ার পেছনে কী কারণ কাজ করছে? ক্রেতারা কি সত্যিই পাকিস্তানি পোশাককেই এখন প্রাধান্য দিচ্ছেন? নাকি এটি নিছক একটি ফ্যাশন ট্রেন্ড, যা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আবার বদলে যাবে? এই অনুসন্ধানে উঠে এসেছে নানা মাত্রিক তথ্য।
গত এক দশকে বাংলাদেশের ফ্যাশন বাজারে অনেক পরিবর্তন এসেছে। একসময় ঈদ এলেই ক্রেতাদের প্রথম পছন্দ ছিল দেশীয় ব্র্যান্ডের পোশাক বা ভারতীয় সিরিয়ালে দেখা জমকালো ডিজাইনের কাপড়। এখন সেই চিত্র বদলে যাচ্ছে। পাকিস্তানের বিভিন্ন ব্র্যান্ডের পোশাক যেমন—গুল আহমেদ, আলকারাম স্টুডিও, সানা সাফিনাজ, মারিয়া বি, আসিম জোফা—এসবের নাম এখন বাংলাদেশি ক্রেতাদের কাছে পরিচিত হয়ে উঠেছে। শুধু নামী ব্র্যান্ডই নয়, পাকিস্তানের ছোট ছোট ডিজাইনার হাউসের পোশাকও অনলাইনে অর্ডার করে কিনছেন অনেকে। এই পরিবর্তনের পেছনে ক্রেতাদের রুচির বদল, ডিজাইনের বৈচিত্র্য এবং সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে দেখা দিয়েছে পাকিস্তানি সংস্কৃতির বিশেষ একটি মাধ্যমের প্রভাব। আসুন, এই দাপটের পেছনের কারণগুলো খতিয়ে দেখা যাক।
আরাম ও ডিজাইনের এক অদ্ভুত সমীকরণ
পোশাক নির্বাচনের প্রথম শর্ত অনেক সময় আরাম। বিশেষ করে ঈদের দিন ঘর থেকে বেরিয়ে আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে ঘুরতে হয়, দীর্ঘ সময় পোশাক পরে থাকতে হয়। তাই আরামদায়ক কাপড় সবার আগে বিবেচনায় আসে। পাকিস্তানি পোশাকের অন্যতম বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর কাপড়ের মান। পাকিস্তানের বিখ্যাত ‘লন’ কাপড় গরমে পরার জন্য খুবই আরামদায়ক বলে পরিচিত। তুলার তৈরি এই কাপড় নরম ও হালকা হওয়ায় গরমে বেশ আরাম দেয়। বাংলাদেশেও এখন লন কাপড়ের চাহিদা বেড়েছে। শুধু লন নয়, শিফন, ক্রেপ আর জর্জেটের মতো কাপড়েও পাকিস্তানি পোশাক বাজারে এসেছে। ক্রেতারা জানাচ্ছেন, এই কাপড়গুলো দেশীয় বাজারে সহজলভ্য অন্যান্য কাপড়ের চেয়ে একটু আলাদা মানের।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী জান্নাতুল ফেরদৌস স্ট্রিমকে বলেন, ‘আমি গত বছর প্রথম পাকিস্তানি লনের একটা থ্রি-পিস কিনি। পরে দেখি, গরমেও পরতে খুব আরাম। কাপড় শরীরে জড়িয়ে যায় না। এবার ঈদের জন্য আরও দুই সেট কিনেছি।’ শুধু আরাম নয়, ডিজাইন ও নকশার কারণেও ক্রেতারা আকৃষ্ট হচ্ছেন বলে জানিয়েছেন বিক্রেতারা। পাকিস্তানি পোশাকে সাধারণত হালকা সুতার কাজ, প্রিন্ট ও এমব্রয়ডারি বেশি দেখা যায়। একেবারে জমকালো কাজ খুব একটা থাকে না। এ কারণে দৈনন্দিন ব্যবহারের পাশাপাশি ঈদের মতো বিশেষ দিনেও এই পোশাক মানিয়ে যায়।
রাজধানীর লালমাটিয়ায় ‘পাক কালেকশন’ নামে একটি দোকানের স্বত্বাধিকারী মোহাম্মদ আলী জানান, ‘আমরা গত তিন বছর ধরে পাকিস্তানি পোশাক আনছি। প্রথম দিকে চাহিদা কম ছিল। কিন্তু গত দুই বছরে বিক্রি অনেক বেড়েছে। এখন প্রতিদিন নিয়মিত ক্রেতা আসছেন। অনেকে তো নির্দিষ্ট করে বলে দেন, অমুক ব্র্যান্ডের পোশাক চাই।’ তাঁর মতে, বাংলাদেশি ক্রেতারা এখন পোশাকের গুণগত মান বুঝতে শুরু করেছেন। আগে হয়তো শুধু দেখতে সুন্দর হলেই কিনে ফেলতেন, এখন কাপড় কেমন, সেলাই কেমন, পরলে কতদিন ভালো থাকবে—সব খতিয়ে দেখে কিনছেন। আর এই মানের দিক থেকে পাকিস্তানি পোশাক বেশ ভালো অবস্থানে আছে বলেই চাহিদা বাড়ছে। পাশাপাশি দামও তুলনামূলক যুক্তিসঙ্গত। বাংলাদেশের ভালো মানের দেশীয় ব্র্যান্ডের পোশাকের দাম যেমন বেড়েছে, অনেক পাকিস্তানি পোশাক তার চেয়ে কম দামে পাওয়া যাচ্ছে। এটিও একটি বড় কারণ।
ভারতীয় সিরিয়ালের ‘পাখি’ থেকে পাকিস্তানি ‘আঘানূর’—পরিবর্তনের গল্প
একসময় ঈদের বাজারে ভারতীয় টেলিভিশন সিরিয়ালের প্রভাব ছিল অপরিসীম। ‘মাসাক্কালি’, ‘আনারকলি’, ‘পাখি’—এসব নাম প্রায় ঘরে ঘরে পরিচিত হয়ে উঠেছিল। অভিনেত্রীদের পরা জমকালো শাড়ি, থ্রি-পিসের ডিজাইন দেখে দেখে বাংলাদেশি ডিজাইনাররা একই রকমের পোশাক বানাতেন। ক্রেতারাও সেসব কিনতে ভিড় করতেন। কিন্তু গত পাঁচ-সাত বছরে সেই ছবি বদলাতে শুরু করে। ইউটিউব ও সোশ্যাল মিডিয়ার দৌলতে পাকিস্তানি নাটক বা ড্রামা সিরিজ বাংলাদেশে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ‘হামসফর’, ‘জিন্দেগী গুলজার হ্যায়’, ‘সুনো চান্দা’—এর মতো নাটকের গান, সংলাপ আর পোশাক তরুণ প্রজন্মের মনে দাগ কাটে।
এর প্রভাব পড়েছে ফ্যাশন ট্রেন্ডেও। পাকিস্তানি নাটকের অভিনেত্রী যেমন—হানিয়া আমির, সজল আলী, আয়েজা খান, মাহিরা খান—তাঁরা নাটকে যে ধরনের পোশাক পরেন, তরুণীরা এখন সেসব খুঁজে বেড়াচ্ছেন। বড় দোপাট্টাওয়ালা লং কামিজ, ঘারারা, শরারা—এসব পোশাকের নাম এখন অনেকের কাছে পরিচিত। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী ফারিহা ইসলাম বলেন, ‘হানিয়া আমিরের নাটক দেখে তাঁর পরা একটা হালকা গোলাপি লন কামিজের প্রেমে পড়ে যাই। পরে অনলাইনে খুঁজে প্রায় একই রকমের একটা কিনে ফেলি। সত্যি বলতে, দেশীয় বাজারে এমন ডিজাইন সহজে মেলে না।’
পাকিস্তানি পোশাকের এই ডিজাইন ও স্টাইল ক্রেতাদের কাছে নতুন লাগছে। অনেক দিন একই ধরনের ভারতীয় ধাঁচের ডিজাইন দেখতে দেখতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন ক্রেতারা। পাকিস্তানি পোশাক সেই ক্লান্তি কাটিয়ে কিছুটা বৈচিত্র্য এনে দিয়েছে। পোশাকে রঙের ব্যবহারও আলাদা। গাঢ় লাল, সবুজ বা নীলের বদলে প্যাস্টেল রং যেমন—হালকা পুদিনা, নরম পীচ, ফিকে গোলাপি, আকাশি—এসবের ব্যবহার বেশি দেখা যায়। এই রংগুলো এখন বাংলাদেশি তরুণীদের পছন্দের শীর্ষে উঠে এসেছে। ফলে স্রোত ধীরে ধীরে ভারতীয় প্রভাবিত ফ্যাশন থেকে পাকিস্তানি ধারায় মিশতে শুরু করেছে।
সোশ্যাল মিডিয়া ও অনলাইন বিপ্লবের হাত ধরে
পাকিস্তানি পোশাকের এই বাজারে আসার পেছনে সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে কাজ করেছে সোশ্যাল মিডিয়া ও অনলাইন প্ল্যাটফর্ম। ফেসবুক, ইন্সটাগ্রাম ও ইউটিউব এখন ফ্যাশন প্রভাবিত করার প্রধান মাধ্যম। পাকিস্তানের ফ্যাশন হাউস ও ব্র্যান্ডগুলোর নিজস্ব সোশ্যাল মিডিয়া পেজ রয়েছে। সেখানে তাঁরা তাঁদের সর্বশেষ কালেকশনের ছবি ও ভিডিও পোস্ট করেন। বাংলাদেশি ক্রেতারা সেসব দেখে সরাসরি অর্ডার দিতে পারেন। অনলাইন পেমেন্ট ও কুরিয়ার সার্ভিস সহজ হওয়ায় এই প্রক্রিয়া এখন অনেক সহজ।
শুধু পাকিস্তান থেকে সরাসরি কেনা নয়, বাংলাদেশের অসংখ্য অনলাইন পেজ এখন পাকিস্তানি পোশাক আমদানি করে বিক্রি করছে। ‘পাকিস্তানি লন ড্রেস’, ‘লাহোর কালেকশন’, ‘করাচি ট্রেন্ডস’—এমন নামে অসংখ্য ফেসবুক পেজ গড়ে উঠেছে। তারা নিয়মিত নতুন পোশাকের ছবি দিয়ে লাইভ ভিডিও করেন। ক্রেতারা ঘরে বসেই পছন্দের পোশাক দেখে অর্ডার দিচ্ছেন। গৃহিণী সুমাইয়া আক্তার বলেন, ‘বাইরে গিয়ে মার্কেটে ঘোরাঘুরি করার সময় হয় না। অনলাইনেই পাকিস্তানি জামার পাতা দেখি। পছন্দ হলে অর্ডার দিই। গত বছর ঈদে তিনটা জামা কিনেছিলাম, এবারও কয়েকটা দেখছি।’
বিক্রেতারাও এই অনলাইন মাধ্যমকে কাজে লাগাচ্ছেন। বসুন্ধরা সিটিতে ‘এথনিক হাট’ নামে একটি দোকানের কর্মচারী জাহিদ হাসান জানান, তাঁরা শুধু দোকানেই পোশাক বিক্রি করেন না, ফেসবুকে নিয়মিত পোশাকের ছবি দেন। অনেকে ছবি দেখে এসে দোকান থেকে কিনে নিয়ে যান। আবার অনেকে ফেসবুক মেসেঞ্জারে অর্ডার দেন, কুরিয়ারে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। তিনি আরও জানান, পাকিস্তানি পোশাকের ডিজাইন ও মান ভালো হওয়ায় পাইকারি ক্রেতারাও এখন এসব পোশাক বেশি কিনছেন। ছোট ছোট জেলা শহর থেকেও অনেক অনলাইন ব্যবসায়ী তাঁদের কাছ থেকে পাইকারি পোশাক কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। এর ফলে পাকিস্তানি পোশাক শুধু ঢাকাতেই নয়, দেশের অন্যান্য প্রান্তেও ছড়িয়ে পড়ছে।
স্থানীয় বাজারে অভিযোজন ও প্রতিযোগিতা
পাকিস্তানি পোশাকের এই দাপট স্থানীয় পোশাক শিল্পের জন্য হুমকি কি না, এমন প্রশ্ন উঠতেই পারে। তবে খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, অনেক বাংলাদেশি উদ্যোক্তা এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের মতো করে ব্যবসা গড়ে তুলছেন। ‘পাকিস্তানি ইনস্পায়ার্ড’ নামে একটি নতুন ধারা তৈরি হয়েছে। অনেক দেশীয় ব্র্যান্ড ও ছোট উদ্যোক্তা পাকিস্তানি ডিজাইন দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে একই রকমের পোশাক তৈরি করছেন, কিন্তু দাম কমিয়ে বিক্রি করছেন। এতে করে আসল পাকিস্তানি পোশাকের দাম যারা দিতে পারেন না, তারাও একই রকম ডিজাইনের পোশাক কম দামে পাচ্ছেন।
রাজধানীর আজিজ সুপার মার্কেটে একটি ছোট দোকান আছে রুবিনা ইয়াসমিনের। তিনি নিজে সেলাই করে পাকিস্তানি ধাঁচের পোশাক বানান। তাঁর দোকানে ৮০০ থেকে ১৫০০ টাকার মধ্যে অনেক পোশাক পাওয়া যায়। রুবিনা বলেন, ‘অনেক ক্রেতা পাকিস্তানি জামার ছবি দেখিয়ে বলে, ঠিক এ রকম একটা বানিয়ে দেবেন। আমি চেষ্টা করি মিলিয়ে বানাতে। দামও কম হয়, কাপড়ও স্থানীয় বাজার থেকে কিনি। অনেকেই খুশি হয়ে কেনেন।’ এটি দেখায় যে বাজার শুধু আমদানি নির্ভর হচ্ছে না, স্থানীয় কারিগররাও নতুন ট্রেন্ডের সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নিচ্ছেন।
তবে কিছু ক্রেতা আবার আসল পাকিস্তানি পোশাকের গুণগত মানের কথাই বেশি বলেন। তাঁদের মতে, নকল বা অনুপ্রাণিত পোশাকে আসল পাকিস্তানি পোশাকের মতো কাপড় ও ফিনিশিং থাকে না। যারা একবার আসল পাকিস্তানি পোশাক ব্যবহার করেছেন, তারা পরের বারও আসল কিনতে চান। ফলে বাজারে আসল ও অনুপ্রাণিত—দুই ধরনের পোশাকেরই চাহিদা রয়েছে। আর এই চাহিদা মেটাতে গিয়ে স্থানীয় উদ্যোক্তা, আমদানিকারক ও খুচরা বিক্রেতা—সবাই কোনো না কোনোভাবে লাভবান হচ্ছেন। ফলে পুরো বাজারটাই সম্প্রসারিত হচ্ছে।
শেষ কথা
ঈদের বাজারে পাকিস্তানি পোশাকের এই দাপট কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়। এটি অনেকগুলো কারণের ফসল। একদিকে যেমন আরামদায়ক ও ভালো মানের কাপড়ের প্রতি ক্রেতাদের আগ্রহ বেড়েছে, অন্যদিকে পাকিস্তানি নাটকের মাধ্যমে তাদের সংস্কৃতি ও ফ্যাশন আমাদের দেশে প্রভাব ফেলছে। সোশ্যাল মিডিয়া সেই প্রভাবকে আরও দ্রুত ও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দিয়েছে। তবে এর অর্থ এই নয় যে দেশীয় পোশাক শিল্প পিছিয়ে পড়ছে। বরং নতুন এই ধারা স্থানীয় উদ্যোক্তাদেরও নিজেদের মানিয়ে নেওয়ার ও নতুন কিছু করার সুযোগ করে দিচ্ছে।
ভবিষ্যতে এই ট্রেন্ড কতদিন থাকবে, সেটা বলা কঠিন। ফ্যাশন সব সময় বদলায়। আজ যা জনপ্রিয়, কাল হয়তো তার জায়গা হয় অন্য কিছু। তবে বর্তমান যে চিত্র, তাতে এটা স্পষ্ট যে পাকিস্তানি পোশাক বাংলাদেশের ঈদ বাজারে একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা দখল করে নিয়েছে। ক্রেতারা যেমন নতুন কিছু পাচ্ছেন, বিক্রেতারাও পাচ্ছেন ব্যবসা প্রসারের সুযোগ। বড় প্রশ্ন হলো, দেশীয় ডিজাইনাররা এই প্রতিযোগিতায় নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে কতটা সক্ষম হন। কারণ শেষ পর্যন্ত ক্রেতা চান বৈচিত্র্য, আরাম আর দামে ভালো মানের পোশাক। যে কেউ এই তিনটি জিনিস দিতে পারবেন, তিনিই বাজারে টিকে থাকবেন।
















