বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্টের কেন্দ্রীয় আইন সচিব এবং সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এডভোকেট ইকবাল হাসান। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রাম-৭ (রাঙ্গুনিয়া) আসনে বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট থেকে মোমবাতি প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। চট্টগ্রাম-৭ আসনের রাজনীতি, আসন্ন নির্বাচনকে ঘিরে জনগণের প্রত্যাশা এবং তার পরিকল্পনা নিয়ে ডিপ্লোটিক বাংলার সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন ডিপ্লোটিক বাংলার নির্বাহী সম্পাদক মুহাম্মদ আরিফুল ইসলাম।
প্রশ্ন: জনাব ইকবাল, আপনার চট্টগ্রাম-৭ (রাঙ্গুনিয়া) আসনের সবচেয়ে বড় তিনটি সমস্যা আপনি কী মনে করেন?
উত্তর: রাঙ্গুনিয়ার সবচেয়ে বড় তিনটি সমস্যা হলো— ১. সন্ত্রাস ও মাদকাসক্তি; ২. মানসম্মত শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার অভাব; ৩. তরুণদের কর্মসংস্থানের সুযোগ না থাকা।
প্রশ্ন: বড় রাজনৈতিক দলের প্রার্থীদের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আপনি নিজেকে কতটা প্রস্তুত মনে করেন?
উত্তর: নির্বাচনে প্রকৃত প্রস্তুতি আসে মানুষের আস্থা, গ্রহণযোগ্যতা ও নৈতিক শক্তি থেকে। বড় রাজনৈতিক দলের প্রার্থীদের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আমি আত্মবিশ্বাসী, কারণ আমি ক্ষমতার জন্য নয়, জনগণের প্রতিনিধিত্ব করতে এসেছি। রাঙ্গুনিয়ার মানুষের সঙ্গে আমার দীর্ঘ ২৬ বছরের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক পথচলা রয়েছে। রাঙ্গুনিয়ার মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা আমি খুব কাছ থেকে অনুভব করি। নির্বাচনে আমার শক্তি রাঙ্গুনিয়ার মাটি ও মানুষ থেকে আসে, কোনো দলীয় শক্তি বা বাইরের প্রভাব থেকে নয়।
প্রশ্ন: রাঙ্গুনিয়ায় শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থানের অবস্থা নিয়ে আপনার মূল্যায়ন কী?
উত্তর: রাঙ্গুনিয়ায় শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থানের অবস্থা এখনও সন্তোষজনক নয়। শিক্ষা খাতে মানসম্মত বিদ্যালয় ও কলেজের অভাব, স্বাস্থ্য খাতে পর্যাপ্ত হাসপাতাল ও আধুনিক চিকিৎসা সুবিধার ঘাটতি এবং তরুণদের জন্য কর্মসংস্থানের সীমিত সুযোগ—এই তিনটি ক্ষেত্রই আজও বড় চ্যালেঞ্জ। আমি বিশ্বাস করি, পরিকল্পিত উন্নয়ন ও সুশাসনের মাধ্যমে এই অবস্থা পরিবর্তন সম্ভব, যাতে রাঙ্গুনিয়ার মানুষ সুস্থ, শিক্ষিত ও স্বাবলম্বী হয়ে উঠতে পারে।
প্রশ্ন: তরুণ ও বেকার জনগোষ্ঠীর জন্য আপনার নির্দিষ্ট কোনো পরিকল্পনা আছে কি?
উত্তর: হ্যাঁ, তরুণ ও বেকার জনগোষ্ঠীর জন্য আমার স্পষ্ট পরিকল্পনা রয়েছে। আমি চাই, রাঙ্গুনিয়ার যুবসমাজকে কারিগরি প্রশিক্ষণ, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা সহায়তা এবং স্থানীয় শিল্পভিত্তিক কর্মসংস্থানের সুযোগ দিয়ে শক্তিশালী করতে। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের জন্য মেন্টরশিপ ও ক্যারিয়ার গাইডেন্স কর্মসূচি চালু করব, যাতে তারা আত্মনির্ভর ও সমাজোপযোগী হয়ে উঠতে পারে। লক্ষ্য হলো—যুবসমাজকে শুধু কাজের সুযোগ দেওয়া নয়, বরং তারা যেন রাঙ্গুনিয়ার উন্নয়নের শক্তি হয়ে উঠতে পারে।
প্রশ্ন: আপনি একজন আইনজীবী। নির্বাচিত হয়ে সংসদে গেলে বিচারব্যবস্থা সংস্কারে কী কী ভূমিকা রাখতে চান?
উত্তর: একজন আইনজীবী হিসেবে আমি বিচারব্যবস্থার বাস্তব দুর্বলতাগুলো কাছ থেকে দেখেছি। সংসদে গেলে ন্যায়বিচার সহজলভ্য করতে মামলা জট কমানো, প্রান্তিক মানুষের জন্য রাষ্ট্রীয় আইনি সহায়তা শক্তিশালী করা এবং বিচারপ্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার পক্ষে কাজ করব। বিচারব্যবস্থা যেন ধনী-গরিব নির্বিশেষে সবার জন্য সমান হয়—এটাই আমার মূল লক্ষ্য।
প্রশ্ন: আপনি বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট থেকে মোমবাতি প্রতীকে নির্বাচন করছেন। ‘মোমবাতি’ প্রতীকটি আপনার এলাকার জনগণকে রাজনীতির কোনো বার্তা দেবে?
উত্তর: মোমবাতি প্রতীক অন্ধকারে আলোর প্রতীক। এটি রাঙ্গুনিয়ার মানুষকে এমন এক রাজনীতির বার্তা দেয়, যেখানে অন্যায়, দুর্নীতি ও সন্ত্রাসের অন্ধকারে সত্য, সততা ও নৈতিকতার আলো জ্বালানো হয়। বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্টের মোমবাতি ক্ষমতার দম্ভ নয়, বরং মানবিকতা, দায়িত্ববোধ ও শান্তিপূর্ণ পরিবর্তনের প্রতীক।
প্রশ্ন: আপনার রাঙ্গুনিয়ার ভোটারদের উদ্দেশ্যে এই নির্বাচনে আপনার মূল অঙ্গীকার কী?
উত্তর: রাঙ্গুনিয়ার ভোটারদের প্রতি আমার মূল অঙ্গীকার হলো—আমি ক্ষমতার জন্য নয়, জনগণের সেবার জন্য রাজনীতি করি। জনগণের ন্যায়্য অধিকার, সৎ নেতৃত্ব ও স্বচ্ছ উন্নয়ন নিশ্চিত করতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করব। আমি এমন একজন প্রতিনিধি হতে চাই, যিনি নির্বাচনের আগে যেমন মানুষের পাশে থাকেন, নির্বাচনের পরেও তেমনই থাকেন।
প্রশ্ন: রাঙ্গুনিয়ার জনগণের সামগ্রিক (অবকাঠামো, শিক্ষা, চিকিৎসা, অর্থনীতি ইত্যাদি) উন্নয়নের পথে কোনো বিষয়টিকে সবচেয়ে বড় বাধা হিসেবে আপনি দেখছেন?
উত্তর: আমার দৃষ্টিতে রাঙ্গুনিয়ার সামগ্রিক উন্নয়নের পথে সবচেয়ে বড় বাধা হলো সুশাসনের অভাব ও দলীয় প্রভাবভিত্তিক সিদ্ধান্ত। পরিকল্পনার ধারাবাহিকতা না থাকা, প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতার ঘাটতি এবং জনগণের প্রয়োজনের চেয়ে রাজনৈতিক বিবেচনাকে অগ্রাধিকার দেওয়াই অবকাঠামো, শিক্ষা, চিকিৎসা ও অর্থনৈতিক উন্নয়নকে পিছিয়ে দিয়েছে। এই জায়গাতেই পরিবর্তন সবচেয়ে জরুরি।
প্রশ্ন: সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হলে আপনার এলাকার জন্য প্রথম অগ্রাধিকার কোনটি পাবে?
উত্তর: সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হলে আমার এলাকার জন্য প্রথম অগ্রাধিকার পাবে মৌলিক সেবা নিশ্চিত করা—বিশেষ করে স্বাস্থ্যসেবা ও যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন। কারণ সুস্থ জীবন ও নিরাপদ যোগাযোগ ছাড়া শিক্ষা, অর্থনীতি কিংবা টেকসই উন্নয়ন কোনোটাই সম্ভব নয়। এই দুই খাতকে শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করানোই হবে আমার প্রথম কাজ।
প্রশ্ন: রাঙ্গুনিয়ার জনগণ কেন এডভোকেট ইকবাল হাসানকেই মোমবাতি প্রতীকে ভোট দেবেন?
উত্তর: রাঙ্গুনিয়ার জনগণ আমাকে মোমবাতি প্রতীকে ভোট দেবেন কারণ আমি ক্ষমতার জন্য নয়—মানুষের কল্যাণের জন্য রাজনীতি করি। আমি রাঙ্গুনিয়ার সন্তান, এখানকার মানুষের দৈনন্দিন সমস্যা ও সম্ভাবনা ভালোভাবে জানি। সততা, জবাবদিহি ও বিশ্বাসযোগ্যতার ওপর ভিত্তি করে আমি তাদের আস্থা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছি। মোমবাতি প্রতীকই এখন রাঙ্গুনিয়ার আপামর জনতার আস্থার প্রতীক।
প্রশ্ন: বালুদস্যুর কারণে রাঙ্গুনিয়ায় যে নদীভাঙন, জলাবদ্ধতা ও পরিবেশগত ঝুঁকি সৃষ্টি হয়েছে, তা মোকাবিলায় আপনার কোনো দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা আছে কি?
উত্তর: রাঙ্গুনিয়ার নদীভাঙন, জলাবদ্ধতা ও পরিবেশগত ঝুঁকি শুধুমাত্র আজকের সমস্যা নয়, এটি আমাদের আগামী প্রজন্মের ভবিষ্যতের জন্যও বিপদ। আমি একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়েছি, যা বালুদস্যু প্রতিরোধ, নদীর ধারাবাহিক নিয়ন্ত্রণ, প্রাকৃতিক বাঁধ ও জলবিন্যাস ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ এবং স্থানীয় সম্প্রদায়কে পরিবেশ সচেতনতা দিয়ে শক্তিশালী করবে।
প্রশ্ন: রাঙ্গুনিয়ায় দীর্ঘদিন ধরে যে উন্নয়ন বৈষম্যের অভিযোগ আছে, আপনি এটিকে কীভাবে দেখেন?
উত্তর: রাঙ্গুনিয়ায় দীর্ঘদিন ধরে উন্নয়ন বৈষম্যের অভিযোগ সত্য এবং দুঃখজনক। এটি মূলত স্বচ্ছ পরিকল্পনা ও ন্যায়্য বরাদ্দের অভাবে সৃষ্টি হয়েছে। আমি বিশ্বাস করি, যদি প্রকল্প বাস্তবায়নে জনগণের চাহিদা ও স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয় এবং স্থানীয় জনগণকে পুরো প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়, তাহলে এই বৈষম্য দূর করা সম্ভব।
প্রশ্ন: রাঙ্গুনিয়ার অন্যতম সমস্যা সন্ত্রাস ও মাদক রোধে আপনার পরিকল্পনা কী?
উত্তর: রাঙ্গুনিয়ার সন্ত্রাস ও মাদক সমস্যা শুধু আইন প্রয়োগের মাধ্যমে সমাধান সম্ভব নয়, এটি সামাজিক সচেতনতা, যুবসমাজের নিয়ন্ত্রণ এবং সরকারি সহযোগিতার সমন্বয় চাই। আমি পরিকল্পনা করেছি, কঠোর আইন প্রয়োগের পাশাপাশি স্থানীয় কমিউনিটি সচেতনতা কর্মসূচি, যুবকেন্দ্রিক শিক্ষামূলক ও খেলাধুলার উদ্যোগ এবং পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত করব। যার মাধ্যমে রাঙ্গুনিয়ার তরুণদের মাদক ও অপরাধের হাত থেকে রক্ষা করা সম্ভব হবে এবং সমাজকে নিরাপদ, সুশৃঙ্খল ও সম্ভাবনাময় জায়গায় পরিণত করা যাবে।
প্রশ্ন: আপনার রাজনীতিকে অনেকে আদর্শভিত্তিক রাজনীতি বলে আখ্যা দেন। এই রাজনীতি বর্তমান বাস্তবতায় কতটা কার্যকর?
উত্তর: আদর্শভিত্তিক রাজনীতি কখনোই সময়ের সাপেক্ষে পুরোনো হয় না। বাস্তবতায় তা হয়তো ধীরগতিসম্পন্ন, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে সবচেয়ে শক্তিশালী ও টেকসই পথ। আমি বিশ্বাস করি, সততা, ন্যায়পরায়ণতা ও মানুষের কল্যাণকে কেন্দ্র করে রাজনীতি করলে তাৎক্ষণিক সুবিধা না পেলেও এক সময় মানুষ সেই আদর্শকে খুঁজে নেন। আজ রাঙ্গুনিয়ার মানুষ অবশেষে সেই সত্য ও ন্যায়ের রাজনীতিকে মূল্যায়ন করছে এবং এটিই তাদের আস্থা অর্জনের মূল কারণ।
প্রশ্ন: দুর্নীতি ও দলীয় প্রভাব থেকে নিজেকে কীভাবে আলাদা রাখবেন বলে জনগণ বিশ্বাস করবে?
উত্তর: আমি দীর্ঘ সাংগঠনিক ও পেশাগত জীবনে নিজেকে সর্বদা স্বচ্ছ ও দুর্নীতিমুক্ত রাখার চেষ্টা করেছি। আমি নির্বাচিত হলে নিজেকে দুর্নীতি ও দলীয় প্রভাব থেকে আলাদা রাখব স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও স্থির নীতি বজায় রেখে। সব প্রকল্প ও সিদ্ধান্তে জনগণের স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিব, ব্যক্তিগত বা দলীয় স্বার্থকে নয়। নিয়মিত জনগণের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ, প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন এবং প্রকাশ্য হিসাবরক্ষণই মানুষের আস্থা জেতার মাধ্যম হবে। আমি চাই রাঙ্গুনিয়ার মানুষ দেখুক, নির্বাচিত হলেও আমি তাদের পাশে থাকব, এবং আমার রাজনীতি হবে নিখুঁতভাবে পরিষ্কার ও দায়বদ্ধ।
প্রশ্ন: আপনি নির্বাচিত না হলে রাঙ্গুনিয়ার মানুষের পাশে থাকবেন কি না; এ বিষয়ে আপনার অঙ্গীকার কী?
উত্তর: নির্বাচন বিজয়ী হই বা না হই, রাঙ্গুনিয়ার মানুষের পাশে থাকা আমার নৈতিক দায়িত্ব। আমি রাজনীতিকে পদ বা ক্ষমতার বিষয় হিসেবে দেখি না; এটি মানুষের সেবা করার অঙ্গীকার। নির্বাচিত না হলেও আইনগত সহায়তা, সামাজিক উদ্যোগ ও ন্যায়সংগত দাবিতে আমি আগের মতোই মানুষের পাশে থাকব। রাঙ্গুনিয়ার সঙ্গে আমার সম্পর্ক ভোটের জন্য নয়, জীবনের, আত্মার, ভালোবাসার।
















