দোহার–নবাবগঞ্জ
আপডেট: ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০০:০৬
ঢাকার দোহার উপজেলার নুরুল্লাহপুরে চার শতাধিক বছরের পুরোনো ঐতিহ্যবাহী গ্রামীণ মেলা নিরাপত্তাজনিত কারণ দেখিয়ে অনুমতি দেয়নি জেলা প্রশাসন। ফলে দূর-দূরান্ত থেকে পণ্য নিয়ে আসা শত শত ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী চরম অনিশ্চয়তা ও আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। অনুমতি না থাকায় অনেকেই স্টল বসাতে পারছেন না, কেউ কেউ মেলার মাঠে পণ্য গুটিয়ে রেখেই অপেক্ষা করছেন।
ব্যবসায়ীরা জানান, মেলা বসবে—এই আশায় আগেভাগেই পণ্য কিনে এনেছেন। কিন্তু শেষ মুহূর্তে প্রশাসনিক বাধায় তাঁদের বিনিয়োগ ঝুঁকিতে পড়েছে। দোহারের করিমগঞ্জ এলাকার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী মো. দুলাল বলেন, “শিশু খেলনা ও সাজসজ্জার জিনিস নিয়ে দুদিন আগে এসেছি। কিস্তিতে মাল কিনেছি। এখন মেলা না হলে এই ক্ষতির দায় কে নেবে?”
ঢাকা ছাড়াও নারায়ণগঞ্জ, শরীয়তপুর, মাদারীপুর, ফরিদপুর ও মানিকগঞ্জসহ আশপাশের বিভিন্ন জেলা থেকে ব্যবসায়ীরা নুরুল্লাহপুরের মেলায় আসেন। শরীয়তপুর থেকে দা–বঁটি নিয়ে আসা ব্যবসায়ী জমসেদ আলী বলেন, “শুধু গাড়ি ভাড়াই লেগেছে প্রায় ২০ হাজার টাকা। প্রতিদিন খাওয়া-দাওয়ার খরচও হচ্ছে। মেলা না হলে বিক্রি ছাড়াই ফিরে যেতে হবে।”
স্থানীয় বাসিন্দা ও পীরভক্তরা জানান, প্রতি বছর মাঘী পূর্ণিমায় কুসুমহাটি ইউনিয়নের সুন্দরীপাড়া গ্রামে হযরত শালাল শাহ (রহ.)-এর দরবারে ওরস অনুষ্ঠিত হয়। এ বছর ৪১৮তম ওরস হওয়ার কথা। শালাল শাহ ছাড়াও তাঁর বংশের আরও সাতজনের দরবারকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে প্রায় এক কিলোমিটার এলাকাজুড়ে ১০–১৫ দিনের গ্রামীণ মেলা বসে আসছে।
মেলার আয়োজকদের একজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, গত ২৯ ডিসেম্বর জেলা প্রশাসকের কাছে ওরস ও মেলার অনুমতি চাওয়া হয়েছিল। প্রশাসন ওরসের অনুমতি দিলেও মেলার অনুমতি দেয়নি। সম্প্রতি থানা কর্তৃপক্ষ মেলা বসতে না দেওয়ার কথা জানায় এবং এলাকায় পুলিশি পাহারা বসানো হয়েছে।
কার্তিকপুর পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ জুবায়দুল ইসলাম বলেন, “প্রশাসনের নির্দেশ অনুযায়ী মেলার মাঠে কোনো দোকান বসতে দেওয়া হচ্ছে না।”
দোহার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাঈদুল ইসলাম বলেন, “মেলার অনুমতি জেলা প্রশাসক দেন। নির্বাচনের কারণে এ বছর অনুমতি দেওয়া হয়নি। তবে ওরস সুষ্ঠুভাবে আয়োজনের জন্য প্রশাসনের সহযোগিতা থাকবে।”
ধর্মীয় অধিকার ও গ্রামীণ অর্থনীতির প্রশ্ন
গ্রামীণ মেলা বন্ধের প্রভাব নিয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফোকলোর বিভাগের অধ্যাপক উদয় শংকর বিশ্বাস বলেন, “গ্রামীণ মেলাগুলো কেবল উৎসব নয়, এগুলো মানুষের দেখা-সাক্ষাৎ ও কথাবার্তার জায়গা। দীর্ঘদিন ধরে এ ধরনের আয়োজন সংকুচিত হচ্ছে, যা গ্রামীণ সংস্কৃতির জন্য অশনিসংকেত।”
তিনি আরও বলেন, “মেলাকেন্দ্রিক ব্যবসায়ীরা সারা বছরের পরিকল্পনা করেন। এই আয়ের ওপর তাঁদের সংসার নির্ভর করে। মেলা বন্ধ হলে গ্রামীণ অর্থনীতি স্থবির হয়ে পড়ে, বিশেষ করে মৃৎশিল্পের মতো ঐতিহ্যবাহী শিল্প দ্রুত হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে।”
কবি ও চিন্তক মোহাম্মদ রোমেল বলেন, “ওরস ও গ্রামীণ মেলা একে অপরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত। ওরস ধর্মীয় অধিকার ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ, আর মেলা গ্রামীণ অর্থনীতির প্রাণ। মেলা বন্ধ করা মানে শুধু গরিব মানুষের উপার্জনে আঘাত নয়, পরোক্ষভাবে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক অধিকারের ওপরও বাধা তৈরি করা। এটি কাম্য নয়।”
চার শতাব্দীর ঐতিহ্যবাহী এই মেলা বন্ধ থাকায় এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—নিরাপত্তার অজুহাতে গ্রামীণ সংস্কৃতি ও জীবিকার এই ধারাবাহিকতা কতটা টিকিয়ে রাখা যাবে।















